বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

আমাকে ভুল বুঝবেন না: পদত্যাগী গভর্নর আতিউর

Dr Atiar Rahman_Press Conference-13রিজার্ভের টাকা খোয়ার যাওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করেছেন, তারা যেন তাকে ভুল না বোঝেন।

মঙ্গলবার তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় দেশের স্বার্থের জন্য কাজ করেছি। দেশের ভালো ছাড়া মন্দ কখনও ভাবিনি। দেশবাসীর কাছে আমার অনুরোধ তারা যেন আমাকে ভুল না বোঝেন।’

ড. আতিউর বলেন, ‘আমি এ দেশের মাটির মানুষ। আমি সাত বছর ধরে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করে আসছি। এ সময় আমি চেষ্টা করছি দেশের ব্যাংকি খাতকে এগিয়ে নিতে। আমি সাধারণ মানুষ এমনকী পথশিশুদের ব্যাংকি সুবিধার মধ্যে নিয়ে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সব সময় দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ গড়ার কাজে তার পরামর্শ অনুসারে কাজ করেছি।’

এক পর্যায়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে গভর্নর বলেন, ‘আমি সারাজীবন সততার সঙ্গে চলেছি। নিজের বাড়ি বিক্রি করে সন্তানদের পড়াশুনা করিয়েছি।’

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করার পর ড. আতিউর রহমান তার গুলশান বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

সাবেক গভর্নর আরো বলেন, আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়েছেন। তিনি আমাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। আমি ২৭ বছর তার সাথে কাজ করেছি। আজকে আমাদের অর্থনীতি কোথা থেকে কোথায় এসেছে আপনেরা জানেন। প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য ছাড়া পারতাম না। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।

রিজার্ভের টাকা হ্যাকের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই ঘটনায় অনেকগুলো ইতিবাচক দিক আছে। এটা একটা সাইবার এটাক। এটা কোথা থেকে এসেছে আমরা জানি না। এটা একটা হাইটেক সাইবার এটাক। তাই আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি এটা কিভাবে হচ্ছে। কোথা থেকে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমাদের মধ্যে অস্পষ্টতা ছিলো। আমরা ঘটনা বুঝতে পারার পর র‌্যাবকে ডেকেছি। বিদেশি তদন্ত সংস্থাকে ডেকেছি।

তবে আমি খুশি, যখন আমি চলে যাচ্ছি তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। আজকে যখন আমি পদত্যাগ করেছি তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। আমি যখন জয়েন করেছিলাম তখন রিজার্ভ ৬ বিলিয়ন ছিলো। আজকে আমার চলে যাওয়ার সময় ২৮ বিলিয়নের উপরে আমাদের রিজার্ভ আছে।

আজকে টাকা অত্যন্ত শক্তিশালি। ৭০ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনভাবে ব্যাংকিং সেবার সুবিধা পাচ্ছে। আমি চেষ্টা করেছি আমাদের দুখি মানুষ, যাদের দিকে কেউ তায়কায় না আমি তাদের অর্থনীতির সুফল দেয়ার চেষ্টা করেছি।

আপনারা জেনে খুশি হবেন সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম একটি উচ্চ মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গভর্নর আতিউর আরও বলেন, আমি একটি নতুন ধারার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছি। সারাবিশ্ব বাংলাদেশ ব্যাংককে মডেল হিসেবে নিয়েছে। জাতিসংঘসহ অন্য প্রতিষ্ঠান আমাদের নাম সুনামের সঙ্গে উচ্চারণ করছে।

আমি প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করেছি, যাতে নারীদের ঋণ দেওয়া হয়। সবুজ পরিবেশে অর্থায়নে উৎসাহ দিয়েছি। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো ব্যক্তির মতো কাজ করছি। রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকে সমস্যা রয়েছে। আশা করি সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নজর দেবেন।

সাইবার আক্রমণ নিয়ে আতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্টে সাইবার আক্রমণ করা দুঃখজনক ঘটনা। এই আক্রমণে আমরা বিহ্বল হয়ে পড়েছি। সাইবার আক্রমণ অনেকটা কম্পনের মতো। এই ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা আসলে বুঝেই উঠতে পারিনি। এই আক্রমণের প্রতিকার হিসেবে আমারা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনেছি। র‌্যাব দিয়ে তদন্ত করাচ্ছি।

সারা পৃথিবীতেই হ্যাকিং হয়েছে। গত সপ্তাহেও ইউএসএতে ৩০বিলিয়ন ডলারের এটাক হয়েছে। এটা একটা ভুমিকম্পের মতো। খুবই অভিনব ও জটিল একটি অজানা বিষয়। এটা বুঝতেও আমাদের সময় লেগেছে। আমরা যখন দেখেছি টাকা চুরি হয়ে গেছে তখন সবার আগে সেন্ট্রাল ব্যাংককে নিরাপদ করার চেষ্টা করেছি। যে বাকি টাকা গুলো চুরি না হয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়োগ দিয়েছে আমি তার কাছেই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। তার দুই চোখ দিয়ে পানি বের হয়েছে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে। আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে সুদীর্ঘ ২৮ বছর কাজ করেছি। আমি একজন মাটির মানুষ হিসেবে মাটি থেকে উঠে এসেছি। আমার এই উত্থানের জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন। আমি মাটি থেকে উঠে এসেছি। আমি ভুমিপুত্র। আমি সন্তানের মতো তিলে তিলে ২৮ বিলিয়ন ডলার জড়ো করেছি। এটা আমার অবহেলার জন্য হারিয়ে যাবে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

ভারত সফর সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি আইএমএফ এর আমন্ত্রণে ভারতে গিয়েছি। ভারতে দুইদিন ছিলাম। দুইদিন ছুটি ছিলো। এটাকে বড় একটা ঘটনা ঘটার কোন কারণ হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন ছিলো না।

রিকশাওয়ালারা এখান থেকে সুবিধা পাচ্ছে। দারিদ্র বিমোচনে সাহায্য করছে। আপনারা যে যেই দলেই বিশ্বাস করেন না কেন। এই দেশটা আমাদের মায়ের মতো আমি আশা করবো আপনারা সেই দৃষ্টিতেই দেশকে দেখবেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রাইভেট ব্যাংকগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমি যেভাবে বলেছি সেভাবেই আমার কথামতো কাজ করেছে। দরিদ্র মানুষের জন্য, কৃষকের জন্য লোন দিয়েছে। আমাদের প্রাইভেট ব্যাংক নিয়ে আমি গর্বিত।

আমি আশা করবো আগামীতে যারা আসবে তারা তরুণের দৃষ্টিতে এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

আরও পড়ুন