নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
ড. হুমায়ুন আজাদ স্যার একটা কথা বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালী জীবন্ত প্রতিভাকে লাশে পরিণত করে: অতঃপর সেই লাশের কবরে আগরবাতি জ্বালায়’। আমাদের অবস্থা এরকমই। কারো একটু ভুল পেলেই তার গুণ ভুলে চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করি। আবার কেউ বিদায় নিলে সেটা দুনিয়া থেকে হোক আর কোন পদ থেকে হোক তার সকল ব্যর্থতাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে দেবতাতূল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকি। এর পিছনে যে কারণটা জড়িত সেটা হচ্ছে আমাদের অত্যধিক আবেগ। আমরা যুক্তির চাইতে আবেগ দ্বারা পরিচালিত। কারো সফলতা কিংবা ব্যর্থতার গঠনমূলক আলোচনা এখানে হয় না। আমাদের যেকোন ব্যক্তির বিশ্লেষণে উপসংহার টানা হয় খুব খারাপ কিংবা খুব ভাল হিসেবে। আমাদের দেশের মানুষ অতিরঞ্জন দোষে দুষ্ট। যদি কেউ গড়পড়তা ভাল কাজ করে তবে তাকে ফেরেশতা বানিয়ে ফেলবে। আবার কেউ যদি গড়পড়তা মানের চেয়ে খারাপ করে তবে তাকে শয়তান থেকেও খারাপ করে চিত্রায়িত করে। বিগত কিছুদিনের ঘটনা প্রবাহে ব্যাপারটা আবারও অনুধাবন করলাম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮০০ কোটি টাকা হ্যাকড হয়ে বেহাত হবার নিউজ বাজারে আসতে না আসতেই দেখলাম সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ালো ড. আতিউর রহমান স্যার কেন ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করছেন না? তিনি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে। এত এত সমালোচনার ভীড়ে ড. আতিউর রহমান স্যারকে একজন সৎ এবং কর্তব্যনিষ্ঠ মানুষই মনে হয়েছে। এই মনে হবার পিছনে তাঁর ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি যে কারণ গুলো উল্লেখযোগ্য ছিল সেগুলো হচ্ছে-
১) তিনিই প্রথম ব্যাংকিং সেবাকে প্রান্তিক জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। কৃষকদেরকে ১০ টাকার বিনিময়ে একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করেছিলেন।
২) ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির এই দেশের ফিসক্যাল পলিসির সাথে একটা পরিপূরক মানিটারি পলিসির সমন্বয় সাধন করতে পেরেছেন। দেশের মুদ্রা ব্যাবস্থাও রেখেছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ।
৩) ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নারী ব্যাংকারদের অধিকার সমুন্নত রাখা; বিনামূল্যে নিয়োগ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা ইত্যাদির মাধ্যমে জনপ্রিয় গভর্নর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।
৪) এসএমই খাতের অগ্রগতিতেও তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
দুই দিন পরে সরকারের নির্দেশে হোক আর স্বেচ্ছায়ই হোক যখনই ড. আতিউর রহমান স্যার দু’ফোটা অশ্রুসহ পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন, ঠিক তখন থেকেই বাঙ্গালী ভুলে গেল সবকিছু। পদত্যাগের পক্ষে জোড়ালো অবস্থানকারীদের অনেকেই আবার অশ্রু বিসর্জন শুরু করলেন। বিপুল ক্রোধানলের পরিবর্তে দুঃখে ফেসবুকে রচিত হতে থাকল শোকগাঁথা। কেউ কেউ অতি আবেগে তাঁকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার অবতার বানিয়ে ফেললেন। কেউ কেউ এই ৮০০ কোটি টাকা হ্যাকড হবার ঘটনায় খুঁজে পেলেন বিশেষ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ষড়যন্ত্র। এটাই স্বাভাবিক আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে। আমরা আমাদের হত্যাকারী, মা-বোনদের ধর্ষণকারীদেরই ভুলে যাই যখন তারা ভাই বলে জড়িয়ে ধরে; এটাতো অনেক মামূলি ব্যাপার। তবে এই অতি আবেগের ভীড়ে এই ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট আরো কিছু বিষয়ের বিশ্লেষণ করার অবকাশ রাখে।
১) একটা প্রতিষ্ঠানে যেকোন দুর্ঘটনা বা খারাপ কিছু ঘটলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দুই ধরনের দায় থাকে। একটা প্রাতিষ্ঠানিক দায়; অন্যটা ব্যক্তিগত দায়। এরকম একটা ঘটনায় উনার ব্যক্তিগত দায় সেটা তদন্ত সাপেক্ষ তবে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়াতে পারেন না। আর এই দায় থেকেই উনি পদত্যাগ করেছেন। তাহলে এখন আহাজাড়ি কেন? একজন মন্ত্রীকে লঞ্চ ডুবিতে আমরা পদত্যাগের দাবি করতে পারলে এই ঘটনায় কেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ অনাকাঙ্খিত হবে?
২) ড. আতিউর রহমান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানানো প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ বাহিনী র্যাবকে ডেকে আনা হয়েছে। আর এসব করতে করতেই আমাদের সময় চলে গেছে। আমরা যদি আগেই এটা প্রকাশ করে দিতাম তাহলে হ্যাকাররা যে টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলো সেটা ধরা পড়তো না’। আমি জানি না এই উক্তিটা উনি সজ্ঞানে করেছেন কিনা। এরকম পরিস্থিতিতে অবশ্যই আনঅফিসিয়ালি হলেও সেটা অর্থমন্ত্রী অথবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানানো উচিৎ ছিল কারন ঘটনার তাৎপর্য অনেক সুদূরপ্রসারী। উনি যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো আর সংবাদকর্মীদের ডেকে এনে ঘটা করে প্রচার করার পার্থক্য না বুঝে থাকেন তবে সেটা চরম অদক্ষতা এবং এটা অবশ্যই খুব বড় একটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
৩) আমরা অনেকেই বলছি যে, এটা মাত্র ৮০০ কোটি টাকা দুর্নীতির ঘটনা; এর চাইতে বড় বড় দুর্নীতিও ঘটে। আমরা আসলে এই ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারিনি। আমাদের পঁয়ত্রিশটা এডভাইস থেকে মাত্র পাঁচটা এডভাইস ট্রান্সফার করেছে। যদি পঁয়ত্রিশটা এডভাইসই ট্রান্সফার হত! এই ঘটনা প্রথম নজরে আনে ফিলিপাইনের ইনকোয়ারার পত্রিকা। সেখান থেকে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বাকি এডভাইসগুলো বাতিলের ব্যবস্থা করে। যদি এই ঘটনা ইনকোয়ারার পত্রিকার রিপোর্টে না আসত তবে কি আমরা পারতাম এই চরম বিপর্যয় রোধ করতে?
৪) যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে তাকাই তবে তাঁর সফলতার পাশাপাশি অনেক বিষয় অন্যকিছু বলবে। তাঁর সময়েই ব্যাড লোনগুলো পুনঃতফশীলিকরণ করার পরও এখনো সেটার হার দুই অঙ্কের ঘরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব সকল তফশীলভূক্ত ব্যাংকের কার্যক্রম মনিটরিং করা। কয়েকটা আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে শুরুতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরিক্ষায় ধরা না পরাও খুব বড় ব্যর্থতা।
৫) রিজার্ভ একজন গভর্নরের সফলতার মাপকাঠি হতে পারে না। আমাদের দেশের রিজার্ভ বাড়ার জন্য তিনটা বিষয় কাজ করেছে এক. বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিক প্রবাহ এই সরকারের সময় বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। দুই. রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। তিন. সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেহেতু রিজার্ভ রক্ষণাবেক্ষণ করে সেক্ষেত্রে এরও কিছুটা ভূমিকা আছে। তবে তিল তিল করে রিজার্ভ গড়ে তোলার কৃতিত্ব যদি কেউ দাবি করতে পারে তবে সেটা প্রবাসী কর্মী, ব্যবসায়ী এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেয়ায় সরকার।
৬) একটা নিরিবিলি ও সমতল রাস্তায় যে কেউ গাড়ি চালাতে পারে। তবে দক্ষ চালকের ক্যারিশমা দেখা যাবে তখনই যখন পাহাড়ি বা বিপদসঙ্কুল রাস্তা আসে কিংবা যখন গাড়িটা কোন দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। এই বিপর্যয়ে যদি তিনি সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারতেন তবে হয়ত তার গভর্নর হিসেবে সাত বছর সফল গভর্নর হিসেবে স্বীকৃতি পেত। তিনি যদি সরকারের মাধ্যমে ফিলিপাইন সরকারকে ০৮ ফেব্রুয়ারির পরপরই জানাতেন তবে হয়ত ফিলিপাইনের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হত। এটা বলার কারণ হচ্ছে সেই টাকাটা ফিলিপাইনের জুয়ার মার্কেটে ছিল ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বিপর্যয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার যোগ্যতাই একজন দক্ষ ও অদক্ষ প্রশাসকের মাঝে একটা পার্থক্য রেখা টেনে দেয়।
৭) শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারীতে ড. আতিউর রহমান স্যার জড়িত না হলেও উনার যথাসময়ে যথার্থ পলিসি গ্রহণের ব্যর্থতা বেশ প্রকটভাবেই ফুটে উঠেছিল। অন্তত যারা ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপার্ট তারা এই বিষয়টা বেশ ভালভাবেই অনুধাবন করতে পারবেন। উনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মার্কেটে বাবল তৈরি হচ্ছিল। তিনি তখন ব্যাংকগুলোকে এক্সপোজার কমানোর জন্য কোন নির্দেশনা দেননি। কিন্তু মার্কেট যখন পড়ে গেল তখন উনি ব্যাংকগুলোকে এক্সপোজার কমানোর জন্য সময় বেঁধে দিলেন। তখন ব্যাংকগুলো এক্সপোজার কমানো চেষ্টা করতে থাকলে শেয়ার হোল্ডাররা বাধ্য হচ্ছিল ফোর্সড সেলে। এর ফলেই অনেক শেয়ার হোল্ডারের সর্বস্ব হারানো ত্বরান্বিত হয়েছিল। যদি এই বাধ্যবাধকতা কিছুটা শিথিল করা হত তবে হয়ত সাধারন শেয়ার হোল্ডাররা লোকসান সমন্বয়ের জন্য কিছুটা সময় পেতেন। এবং অন্তিম মুহূর্তের এই সিদ্ধান্ত শেয়ার মার্কেট পতনের মূল কারণ না হলেও পতন ত্বরান্বিত করতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল।
পরিশেষে, আমরা প্রত্যাশা করি চুরি যাওয়া অর্থ যথাসম্ভব ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সেই সাথে তদন্তে বের হয়ে আসুক কারা চুরি করল, কিভাবে চুরি হল, ভিতরের কারা জড়িত। ড. আতিউর রহমান বিদায় নিয়েছেন। তাঁকেও তদন্ত প্রক্রিয়ার মাঝে রাখা; খুঁজে দেখা উনাকে কেউ কালক্ষেপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানানোর জন্য ভুল বুঝিয়েছেন কিনা। ড. ফরাসউদ্দিনের তদন্ত কমিটির উপর আস্থা রাখতে চাই। তিনি একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। যথার্থ তদন্তে প্রকৃত দোষীরা ধরা পড়ুক এবং শাস্তির আওতায় আনা হোক যেন ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনা পুনর্বার ঘটানোর সাহস কেউ না করে। সেই সাথে নতুন গভর্নরকে বাংলাদেশ ব্যাংকে তাঁর সামনের দিনগুলোর জন্য শুভকামনা।


