২৫ মার্চ বাংলাদেশে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে সরকারি ঘোষণার জন্য এবং এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গত এক যুগ ধরে আন্দোলন করছে। শহীদজননী জাহানারা ইমাম ২৪ বছর আগে ২৫ মার্চ গণহত্যার কালরাত্রি হিসেবে পালনের জন্য যে আলোর মিছিলের সূচনা করেছিলেন আমরা তা অব্যাহত রেখেছি।
আমাদের দাবি এবং গণহত্যার ভিকটিম আর্মেনিয়া সহ আরও কয়েকটি দেশের দাবির প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ বছরের একটি দিনকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও গত বছর (২০১৫) ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কারণ ১৯৪৮ সালের এই দিন গণহত্যাকে নিন্দা জানিয়ে গণহত্যা নিবারণের জন্য জাতিসংঘ গণহত্যা কনভেনশন (Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide : General Assembly Resolution 260) ঘোষণা করেছিল। এর ফলে আমাদের ১২ বছরের দাবির একটি অংশের আর কার্যকারিতা থাকছে না।
এর পরিবর্তে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘বাংলাদেশে গণহত্যা’-র আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য প্রচার অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, কারণ পশ্চিমের শক্তিধর দেশগুলো সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনও বাংলাদেশের গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশ সরকারও ‘২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষনা করেনি। আর্মেনিয়ার গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সে দেশের সরকার ও জনগণকে প্রায় ১০০ বছর প্রচার অভিযান চালাতে হয়েছে।
ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সংসদে পাশ করা ‘ল এগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’ বলে একটা আইন আছে। জার্মানির নাৎসি বাহিনী ইউরোপে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তাকে অস্বীকার বা এর তীব্রতাকে লঘু করার হীন প্রচেষ্টাকে আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সে আইনে। সেই সাথে মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা বা প্রশ্ন তোলাকে ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ‘রিভিশনইজম’এর দোহাই দিয়ে যারা হলোকাস্ট বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণের চেষ্টা করেন, তাকেও ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোদ্দাকথায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনী দ্বারা গণহত্যা হয়েছে, এটার অন্য কোনও ধরনের পাণ্ডিত্যমূলক অপব্যাখ্যা দেওয়া চলবে না।
অর্থাৎ একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়ার অর্থই হচ্ছে উপরে উল্লেখিত আইন করা। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনো একাত্তরের গণহত্যাকে রাষ্ট্রিয় ভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, তাই খুব সহজেই ডেভিড বার্গম্যান, বেগম খালেদা জিয়া, গয়েশ্বর রায়, ফরহাদ মাজহার ছাড়াও অনেকে একাত্তরের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহস পায় এবং বিষয়টিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এছাড়াও একাত্তরের কৃত যুদ্ধ অপরাধের জন্য সংগঠন হিসেবে জামায়াত ইসলামী এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিচার করার কাজের যৌক্তিকতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত হবে, যা বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারনে সম্ভব হচ্ছে না।
২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতি বছর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ২৫ মার্চ কালরাত্রি পালনের অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রীরা এবং নীতিনির্ধারকরা বহুবার বলেছেন মহাজোট সরকার ‘২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করবে, যা এখনও করা হয়নি। প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা আগামী ২৫ মার্চ (২০১৬) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার ৪৫ বছর উপলক্ষে ৪৫টি মশাল প্রজ্জলন করব এবং মোমের আলোর মিছিল নিয়ে জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদের প্রতি আমাদের গভীরতম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করব।
সকল জেলা ও উপজেলা সহ দেশে ও বিদেশে আমাদের সকল শাখা এবং শুভানূধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি― যেখানে শহীদ মিনার আছে সেখানে শহীদ মিনারে গিয়ে, যেখানে তা নেই সেখানে যুদ্ধের স্মারক কোনও স্থানে কিংবা কোনও স্মৃতিসৌধে সমবেত হয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের গণহত্যার ভিকটিমদের স্মরণ করবার জন্য। বহির্বিশ্বের শাখা ও শুভানূধ্যায়ী বন্ধুদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি মেক্সিকো থেকে ভিয়েতনাম এবং সর্বশেষ ইরাক ও সিরিয়া পর্যন্ত যে সব দেশে গণহত্যা হয়েছে সে সব দেশের নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে ২৫ মার্চ গণহত্যায় নিহতদের স্মৃতি প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং গণহত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তির দাবি উত্থাপনের জন্য― যাতে আমাদের বিশ্ব গণহত্যার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়।
সংগ্রামী শুভেচ্ছা সহ
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের পক্ষে,
সাব্বির খান,
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি
১৮ মার্চ, ২০১৬


