মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু।
বিএনপির আসছে কাউন্সিল অধিবেশনে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল আলমগীরকে মহাসচিব করা নিয়ে একটি সংবাদ ইতিমধ্যেই মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছে। তবে দলের শুভাকাংখীরা মনে করেন এই মুহুর্তে বিএনপিতে প্রয়োজন নুতন কারিশমাটিক একজন নেতা। তারা মনে করেন দলের ভাঙ্গনকে ঠেকানোর জন্য ফখরুল আলমগীরকে মহাসচিব করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই কারণেই সম্ভবত তারেক রহমান ও খালেদা জিয়া এধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে সমালোচকেরা বলেন বাংলাদেশে অতীতের আন্দোলনে ফখরুল আলমগীর কোনো উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখতে বের্থ হয়েছেন। গ্রেফতারের ভয়ে ওই সময় তিনি পালিয়ে বেরিয়েছেন। তার এধরনের কার্যকলাপে তারেক রহমান নিজেও তখন বিরক্ত প্রকাশ করেছেন। তৃণমূলের কর্মীরা যখন সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আন্দোলন করেছে তখন ফখরুল আলমগীর সহ কেন্দ্রের অনেক নেতারা গা ঢাকা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে বিএনপিকে ফখরুল আলমগীর এখন নাই নাই অবস্থায় নিয়ে এসেছেন বলে অনেকে মনে করছেন। পর্যবেক্ষক মহল ধারণা করেছিলেন এবার ফখরুল আলমগীরকে প্রেসিডিয়ামের সদস্যের দায়িত্ব দিয়ে দলের পরীক্ষিত নেতা গয়েশ্বর রায়কে করা হবে মহাসচিব। জানা যায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি ও ইসলামী দলগুলো গয়েশ্বর রায়কে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মানতে আপত্ত্বি জানিয়েছে। এছাড়াও দলের ভেতরে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাও গয়েশ্বর রায়কে মহাসচিব করার বেপারে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই মুহুর্তে বিএনপির নেতৃত্বে একটা পরিবর্তন আসবে বলেই দলের কর্মী ও নেতারা আশা করেছিলেন। বিএনপির এই জটিল মুহূর্তে ফখরুল আলমগীর দলে কোনো নুতন জাগরণ তুলতে পারবেন কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে শারীরিক দিক থেকেও তিনি ততটা ফিট নয়। তবে মহাসচিব পদ ফখরুল আলমগীরকে দেওয়া হলেও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন নুতন মুখ আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপির এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সেখান থেকে পুনরায় উঠে আসা আর আদৌ সম্ভব হবে কি না বলা কঠিন। তবে রাজনীতিতে সবকিছুই সম্ভব। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে গিয়ে হানাদার পাকসেনাদের সাহায্য করে পরবর্তিতে বিএনপির সহযোগিতায় যদি জামায়াত ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারে তাহলে এই বাংলাদেশে সবকিছুই সম্ভব। তাই হয়তো অনেকে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে এখনো দলটির হাল ধরে আছেন। এত ঝর ঝাপটা যাওয়ার পরও বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকার আরেকটি প্রধান কারণ হলো এখন পর্যন্ত দেশে সরকার বিরোধী কোনো শক্ত রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে রাজপথে আন্দোলন করার শক্তি এই মুহুর্তে একমাত্র বিএনপির আছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। এই কারণেই সরকার বিরোধী আন্দোলনের বেপারে সকলেই এখনো বিএনপির উপরই নির্ভর করে আছেন। ইতিমধ্যে দল থেকে কাউন্সিল অধিবেশনের পর মাঠে নামার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলন ও সরকার উত্খাতের ঘোষণা বিএনপি এর আগেও আরো অনেকবার দিয়েছে। রাজনীতির মাঠে বিএনপির এধরনের হুঙ্কার নুতন কিছু নয়। সুতরাং তাদের এধরনের হুমকিতে সরকার আর তেমন তওয়াক্কা করে না।
জনগণ এখনো মনে করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু ও সত্যকে বিতর্কিত না করে এবং জামায়াতের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করলে বিএনপি আবারও রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে দাড়াতে সক্ষম হবে। এজন্য পাকিস্থানিদের তুষ্ট করার নীতি থেকে দলটিকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বর্জনের মধ্য দিয়ে দলকে সামনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষে নুতন ভাবে নুতন নেতৃত্বে বিএনপিকে সংগঠিত করতে হবে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন বিএনপিকে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সহ অন্যান্য ধর্মের মানুষদের পাশে এসে দাড়াতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বর্জন করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তলার চেষ্টা করা হবে বিএনপির জন্য ইতিবাচক। জামায়াতিদের লবিং আর টাকার খেলা থেকে দলকে সরিয়ে আনতে হবে। বিএনপিকে তাদের রাজনীতির হারানো আসন ফিরে পেতে হলে পচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে হত্যা হওয়ার দিন কেক কেটে জন্মদিন পালন না করে দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করলে দলটির জন্য হবে উত্তম। এধরনের উদ্যোগে খালেদা জিয়ার মর্যাদা বাড়বে বলেই দলের শুভাকাংখীরা মনে করেন।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সব দল-মতের সমর্থন ও সাহায্যের যেমন প্রয়োজন ছিল এখন দলটির জন্য সে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। বিএনপি এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল। যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি ও শাস্তি হওয়ার পর বিএনপির আর জামায়েতের সাথে সম্পর্ক রাখার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন না। তাহলে জামায়াতের সাথে সম্পর্ক রাখা আর না রাখা নিয়ে কেন এখনো চলছে বিএনপির এই আভ্যন্তরীণ দন্ধ? যুদ্ধপরাধীদের বুদ্ধি-পরামর্শ বা সাজেশনে আসলে এখন আর কোনো কাজে আসবে না। দলটিকে এখন নুতন আদর্শে নুতন পথে নুতন স্বরূপে বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মতো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, চেতনা, ইতিহাসকে সামনে নিয়ে বিএনপি যদি এগিয়ে আসে তাহলেই একমাত্র দলটির ভবিষ্যতে উজ্জল হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তা না হলে জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি দিন দিন বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে। অর্থাত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে হলে দলের আদর্শে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।
আসছে কাউন্সিল অধিবেশনে নুতন নেতৃত্ব সৃষ্টি করে নুতন আদর্শে বিএনপি এগিয়ে আসবে বলেই দলের শুভাকাংখীরা আশা করছেন। এখন দেখা যাক বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান দলের কর্মীদের সে আশা পূরণ করতে কতটা সফল হতে পারেন। বিএনপির ভবিষ্যত কি হতে পারে তা বলবে দলের আসছে কাউন্সিল অধিবেশন। হয় বিএনপি হবে বিভক্ত না হয় শক্তিশালী? আসছে সন্মেলনে মির্জা ফখরুল আলমগীরকে মহাসচিব করে বিএনপি কি তাহলে ভুল করতে যাচ্ছে? না কি দেখাবে নুতন কোনো চমক?


