বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ খেলা ছেড়ে চলে আসতে পারবে কি?

Debobrotoদেবব্রত মুখোপাধ্যায়।

তাসকিনের বোলিং অ্যাকশনকে অবৈধ বলতে গিয়ে আইসিসির কর্মকান্ড দৃশ্যত এখন ‘অবৈধ’। এ নিয়ে যা যা হচ্ছে, যা যা হতে পারে, তা এখন সকলেই জানেন।

তারপরও আমার বা আরও অনেকের অনেক অনেক প্রশ্ন তৈরী হয়েছে। ইনবক্সে, কমেন্টে বা সরাসরি করা সব প্রশ্নের জবাবও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই একটা ‘কুইক গাইড’ তৈরীর চেষ্টা করলাম। যেহেতু মুহুর্তের মধ্যে কাজটা করেছি, তাই গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন বাদ পড়ে যেতে পারে।

তেমন হলে প্রসঙ্গটা উত্থাপন করলে এখানে উত্তর দিয়ে দেওয়া হবে।

সবাই তাসকিন-তাসকিন করছে। আরফাত সানির কথা কেউ বলছে না কেনো?

আরফাত সানির ব্যাপারে আইসিসির ল্যাব (শ্রী রামচন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাগার) থেকে যে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে, তা আইনের ভেতরে থেকেই পাঠানো হয়েছে। তাতে প্রমানিত হয়েছে, সানির বেশীরভাগ ডেলিভারি আসলেই নিয়মের বাইরে চলে যায়। ফলে এ নিয়ে আপত্তি করার তেমন কিছু নেই।

আরেকটু তথ্য: সানি আগে থেকেই একটু সন্দেহে ছিলেন। স্থানীয় কোচরাও তার ব্যাপারে নিঃসংশয় ছিলেন না। ফলে তার ব্যাপারটা সারপ্রাইজ নয়।

সানির ব্যাপারে আগেই জানা থাকলে তাকে দলে রাখা বা তার কারেকশন নিয়ে কাজ না করা বিসিবির ব্যর্থতা কি না?

অবশ্যই। তবে এখন ফোকাস নড়ে যাবে বলে এ নিয়ে কথা কম বলা হচ্ছে। আগে-পরে বিসিবির দুর্বল মনিটরিং নিয়ে অনেক কথা হয়েছে।

তাসকিনের ব্যাপারে আমরা কি বেশী বেশী করছি?

না। ইতিমধ্যে ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খানের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সবাই দেখে ফেলেছেন, তাকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটা কেমন অস্বচ্ছ ও অন্যায় হয়েছে। যারা দেখেননি, তারা এই লিংকে গিয়ে দেখে নিতে পারেন।

আচ্ছা, তাসকিন কী ষড়যন্ত্রের শিকার?

অনেকে বলছে ওই ফটোশপ ছবিটাই কাল হলো।

কোথাও একটা ‘কিন্তু’ হয়তো আছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের ধারণাগুলোর পক্ষে কোনো পরিষ্কার প্রমাণ না পাওয়া অবদি এগুলো ধারণার চেয়ে বেশী কিছু নয়। ফলে এটা আর যাই হোক, আনুষ্ঠানিক ফোরামে বলার মতো বিষয় নয়।

বিসিবি এখন কী করছে?

আইনজীবির পরামর্শ অনুযায়ী আপিল করছে। এই আপিলটা ৭ দিনের মধ্যে করার বিধান আছে। ফলে আইসিসি আপিলের জবাব বিশ্বকাপ শেষেও দিতে পারে।

এর বাইরে বিসিবি কিছু করছে না?

করছে। আইসিসিতে বিগ থ্রি চক্র ভেঙে দিতে চাওয়া নতুন চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহরের সাথে বিসিবি সভাপতি আলাপ করেছেন। আইসিসি সিইও’র সাথেও কথা হয়েছে। মূলত মনোহরের আগ্রহে গতকাল রাতেও আইসিসিতে আন অফিশিয়াল কিছু বৈঠক হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দেখছেন। মৌখিক এই অভিযোগে কাজ হলে আপিলের আগেই সিদ্ধান্ত চলে আসতে পারে।

সে ক্ষেত্রে তাসকিন কী বিশ্বকাপ খেলতে পারে?

ক্ষীণ একটা চান্স আছে। যদি আইসিসি বলে, সিদ্ধান্তটা সন্দেহজনক; তারা পুনর্বিবেচনা করবে। তাহলে সিদ্ধান্ত স্থগিত (স্টে) থাকতে পারে। তা হলে তাসকিন খেলতে পারবে।

তাসকিন এখন কোথায়?

ব্যাঙ্গালুরুতেই আছে। বিসিবি আইসিসির কাছ থেকে কোনো কিছু না জানা অবদি তাকে দেশে ফেরাবে না। রায় বদলালেই যাতে মাঠে নামতে পারে।

তখন তাসকিন কার বদলে দলে খেলবে? ইতিমধ্যে তার বদলে তো শুভাগত দলে ঢুকে গেছে।

তাসকিনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হলে তার বদলীর আদেশ অটোমেটিক স্থগিত হবে। শুভাগত তখন দলের একজন বলে বিবেচিতই হবে না। তাসকিনকে কারো বদলী হতে হবে না।

মাশরাফি কী রানাতুঙ্গার মতো কিছু করতে পারে না? মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো কিছু।

রানাতুঙ্গার পরিস্থিতি অমন ছিলো। মুরালিধরণ পরীক্ষায় পাশ করে আসার পর ড্যারেল হেয়ার মাঠেই ‘নো’ বল ডাকছিলেন। ফলে মাঠেই আউটবাস্ট হয়েছিলো। এখানে সবকিছু ঘটেছে মাঠের বাইরে। ফলে দল নিয়ে মাঠে গিয়ে তারপর কোনো ঘটনা ছাড়া বেরিয়ে আসাটা হাস্যকর ব্যাপার।

তারপরও। রানাতুঙ্গা তো কিছু একটা করেছিলেন। মাশরাফি না খেলার ঘোষনা দিক।

রানাতুঙ্গা যখন ঘটনাটা ঘটিয়েছিলেন, তখন ক্রিকেট পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম ছিলো। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের হাত থেকে বেরিয়ে এসে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা একটা নতুন জোট করেছিলো। রানাতুঙ্গার এই সিদ্ধান্তের পেছনে তখনকার নবাগত এই শক্তিধর জোটের সমর্থন ছিলো। ফলে এতে শ্রীলঙ্কার একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয় ছিলো না।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাহলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন করুক।

আবার ওপরের উত্তরটা দিতে হবে। বিসিবি এটা করলে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখানেই শেষ হয়ে যাবে। এখন বিশ্বে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স করার একাধিক জোট নেই। একটাই ক্ষমতাধর জোট-বিগ থ্রি। বাংলাদেশ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আইসিসি একবার মাত্র ফিরে না তাকিয়ে বাংলাদেশকে বহিষ্কার করবে। আর এখানে কোনো পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা কখনোই বাংলাদেশের সাথে খেলবে না। আপনারা নিশ্চয়ই আবাহনী-মোহামেডানের খেলা দেখে জীবনটা পার করে দিতে পারবেন না?

বরং বিগ থ্রি তাতে খুশী হবে। বাংলাদেশ নিজে আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট থেকে সরে গেলে এই কথা মানুষ কয়েক বছর পর একটু ভুলে যাবে। কিন্তু আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট দেখার ক্ষুধা এই জাতির থেকে যাবে। ফলে এখানে তৈরী বাজারে তখন তারা বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট আরও বেশী বেচতে পারবে।

এমন ক্ষেত্রে  বাংলাদেশ কী জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোর সমর্থন পাবে না?

না। কারণ, এই দলগুলোরও প্রধান আয়ের উৎস বিগ থ্রির তিন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলা। যেহেতু এখন আইসিসির এফটিপি বলে কিছু নেই। সমস্ত দ্বিপাক্ষিক সিরিজ এখন পারষ্পরিক সমঝোতার বিষয়। তাই সিরিজ পেতে সব দলকেই বিগ থ্রির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তাদের চটিয়ে কেউ বাংলাদেশকে সমর্থন করবে না।

মাশরাফি কান্না করলো, রানাতুঙ্গার মতো ঝুকি নিয়ে বীরত্বটা তো দেখাতে পারলো না।

মাশরাফি সিনেমায় অভিনয় করছে না। ফলে তার দেখানোর কিছু নাই। তবে দেখতে চাইলে দেখতে পাবেন, রানাতুঙ্গার চেয়ে সে বেশী ঝুকি নিয়ে ফেলেছে। রানাতুঙ্গার পাশে বড় একটা জোট ছিলো, তাই সে নিষেধাজ্ঞার ঝুকি নিতে পেরেছে। সে জানতো, নিষেধাজ্ঞা এলেও টিকবে না। মাশরাফির সে নিশ্চয়তা নেই। অথচ সে সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছে, তা আইসিসির কোড অব কন্ডাক্ট অনুমোদন দেয় না। সে আইসিসির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারে না। এটা আমলে না নিয়ে মাশরাফি পরিবারের প্রধাণ হিসেবে নিজেকে সামনে ঠেলে দিয়েছে। ক্রিকেট ইতিহাসে এই ঘটনা নজিরবিহীন।

আরও পড়ুন