বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

অতৃপ্ত মহিলার যৌন আনন্দ ও পুরুষ বেচাকেনা এবং আনন্দবাজার

Shamima-Rahmanশামীমা বিনতে রহমান।

সম্প্রতি কলকাতা ঘুরাঘুরির দিনগুলাতে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করে জন্ম নেয়া চুরানব্বই বছর বয়সী আনন্দবাজার পত্রিকার বিজ্ঞাপন আমাকে আটকায়া রাখলো কিছুক্ষণ।বাংলাভাষায় ইংরেজি বানানে কিছু শব্দসহ বিজ্ঞাপনগুলোতে ‘Hi Profile মহিলা’, ‘নিসঙ্গ অতৃপ্ত মহিলা’, ‘বোল্ড রিলেশন’, ‘বন্ধু হয়ে আয় করুন’ শব্দগুলা পড়ার সময় খেয়াল করি ছবি হিসাবে ফটোগ্রাফ বা পেইন্টিংয়ে পুরুষের ছবি নাই। নারীর শরীরের সেক্সি ভঙ্গিমা। আমি কনফিউজড। “ফ্রেন্ডশীপ” শিরোনামে এই বিজ্ঞাপনগুলাতে আসলে কোনটা পণ্য, পুরুষের যৌনতা নাকি নারীর যৌনতা আর কে খরিদদার? এসব ধন্দে ঘূর্ণির ভেতর থেকে বের হয়ে বুঝলাম-ভেতরের পুরা পৃষ্ঠার অর্ধেক জুড়ে এই ফ্রেন্ডশীপের মাধ্যমে টাকা আয়ের আহবান হলো পুরুষের প্রতি। মানে মেল (পুরুষ) এসকর্টদের জন্য বিজ্ঞাপন। কিন্তু কোনও পুরুষের সেক্সি ফটোগ্রাফ বা স্কেচ নাই। তারপরও এর মানে হচ্ছে যৌন বিক্রেতা পুরুষ আর তার ক্রয় যোগ্য যৌনতা টাকা দিয়ে কিনছেন পশ্চিম বাংলার নারীরা।

কলকাতার প্রথম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা সল্টলেকে একটা শান্ত শিষ্ট ভিড়-বাট্টাহীন স্ক্যানারের দোকানে ব্রডশিটে ছাপানো আনন্দবাজার পত্রিকা দেখে অনেক আগে মানে ২০০৭-০৮র সময় ছাপানো পত্রিকা দেখে যেরকম উত্তেজিত হতাম, তার চেয়ে মামুলি উত্তেজনায় পত্রিকাটা হাতে নিলাম। ইন্টারনেটে অনলাইন ভার্সনে এই পত্রিকা দেখার অভ্যস্ততা অফলাইনে প্রায় কাছাকাছি হেডলাইন দেখলাম। দিল্লির জহওয়ার লাল নেহেরু ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থী নেতা কাহনাইয়া গ্রেফতার হওয়ার পর কোলকাতা যাদবপুর ইউনিভার্সিটির অ্যক্টিভিটিজ। আমি সরাসরি চলে গেলাম ভেতরের পৃষ্ঠায় যেখানে বিজ্ঞাপন থাকে। বিজ্ঞাপন আমার কাছে একটা উইন্ডো-যেইটা দিয়ে টাকা পয়সার গতিবিধি, পণ্যের ধরণ, চলাচল, সম্পর্কের লেনদেন, নারী-পুরুষ-শিশু এসব দেখা যায়। এসব দেখতে তো আমার এম্নিই ভাল্লাগে।

আমি দেখি ভেতরের দুই পৃষ্ঠায় অর্ধেক করে পৃষ্ঠা ভরা “ফ্রেণ্ডশীপ” নামের বিজ্ঞাপন। কোনটার শিরোনাম সাগরিকা, কোনটা রাগিনী, অপ্সরা, অন্তরালে, বেবিডল, তিতলী, চোখের বালি, ম্যানফোর্সেস, বেবিডল-এরকম অনেক নাম-দেখলে মনে হবে এটা ফিমেল এসকর্ট বা নারী যৌনসঙ্গীর জন্য বিজ্ঞাপন, মানে নারী যৌনতা বেচার জন্য বিজ্ঞাপন দিসে।

ভারতীয় শালীনতা সম্ভবত এরকম: যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়ে নারীর সেক্সি ইমেজ প্রচার করা বা বিক্রিযোগ্য করা অশালীনতা নয়, কিন্তু পুরুষের সেক্সি ইমেজ প্রচার করা অশালীন। তাই বিক্রেতা পুরুষের কোন ন্যুড, সেক্সি ফটো দেখা যায় না বিজ্ঞাপনে। এই মনোভঙ্গিটা এ কারণে সম্ভবত: যেই আননন্দবাজার পত্রিকাতে হামেশাই এখন এরকম বিজ্ঞাপন বের হচ্ছে, সেই পত্রিকাটি ব্রিটিশ শাসন সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কোলকাতা মধ্যবিত্তের মনভূমির রুচি তৈরি করে যাচ্ছে।

তাই বিজ্ঞাপনগুলার ভাষায় ভারতীয় মধ্যবিত্ত ভঙ্গীতে সরাসরি না বলে, যৌনতা বিক্রির অফার এসেছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলা থেকে এভাবে: “গোপনে নিজের চাহিদা পুরুন করুন” বা “ প্রচুর আনন্দ করে ইনকাম করুন” বা “বোল্ড সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে ইনকাম করুন” জাতীয় আভাস রাখার মাধ্যমে, যেই আভাস আবার আভাস হিসাবে নয়, মেইল এসকর্ট হিসাবে সরাসরি প্রকাশিত হচ্ছে উপনিবেশের মাধ্যমে পাশ্চাত্য মডার্নিটি এ অঞ্চলে আমদানী করা ব্রিটেনে।

চলুন প্রিয় নারী ও পুরুষ পাঠক, একটু বিজ্ঞাপনের ভাষাগুলো থেকে ঘুরে আসি।

রঙ্গীন বসন্ত নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের বিজ্ঞাপনে লিখেছে: “পশ্চিমবাংলার বাছাই করা ৯৯৯ সুন্দরীদের সংস্পর্শে এসে উচ্চমানের আয় করে বঙ্গরাজা হন”। এরা একটা উইন্টার অফার দিয়েছেও এবং এরা বলেছে এরা সরকার অনুমোদিত।

ফেইরি কুইন নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এরকম: “হতাশ জীবনে সিকিউরিটি মানি বা গ্রীনকার্ডের চক্রান্তে অন্যত্র প্রভাবিত না হয়ে নিসঙ্গ অতৃপ্ত মহিলাদের সাথে রিলেশন করে আয় করুন”। “বিফলে ফি ফেরত”।

হটগার্ল নামে আরেকটা প্রতিষ্ঠানের অফার: “বড় ঘরের সুন্দরী মহিলাদের সাথে মধুর সম্পর্ক করে গোপনে নিজের চাহিদা পূরণ করুন”। কিছু অফার এতো বেশি সাম্প্রতিক ব্রিটিশ সমকালীন যে বিজ্ঞাপন মনে করায়ে দিবে যে, কোলকাতা একসময় উপনিবেশকারী ব্রিটিশদের রাজধানী ছিল। এই যেমন এই বিজ্ঞাপন: “হাই-ফাই সুন্দরী মহিলাদের সঙ্গে পার্টি ভ্রমন গাড়ি থাকা খাওয়ার সুবিধা ও আয় করে প্রতিষ্ঠিত হন”(সিটি লাইফ)।

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন যেমন: “আমি রাখি, আমার সাথে বন্ধুত্বের মাধ্যমে প্রচুর আনন্দ করে ইনকাম করুন”।

বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, নিজের নাম ব্যবহার করে সরাসরি নারীর অফার করা ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন অল্প।

বাংলাদেশে প্রস্টিটিউশন, বেশ্যা, যৌনকর্মী শব্দগুলা নারীর চেহারাসহ অনেক উচ্চারিত হলেও “মেল এসকর্ট” খুব বেশি উচ্চারিত নাম না পাবলিক পরিসরে। তবে সামর্থবান নারীরা যে যৌন সম্পর্ক করে চলছেন এখানে সেটা অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় প্রথার মতো, সরাসরি টাকা না… সরাসরি উচ্চারিত ক্যাটাগরিক্যাল প্রফেশন হিসাবে “মেইল এসকট” এখনো দেখা যায় নাই এইখানে।

পশ্চিম বাংলার আনন্দবাজার বিজ্ঞাপনেও উচ্চারিত হয়নি সরাসরি এই শব্দ বরং, যেন জর্জেটের শাড়ির ভেতর দিয়ে নারীর শরীর দেখানোর বলিউড মুভির প্রেজেন্টেশনের মতো। এইরকম মধ্যবিত্ত রুচি মেইনটেইনকারী বিজ্ঞাপনে একবারও কোথাও উল্লেখ নাই সেক্স বা যৌনতা শব্দ অথবা কী ধরণের সেক্সুয়াল সার্ভিস দিবে নারীকে, অথবা পিনাসের সাইজ অর্থাৎ পন্যের বিবরণ। তবে বিজ্ঞাপন পড়ে আপনাকে বুঝে নিতে হবে।

আনন্দবাজার পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের ছবি দেখে আমার মনে পড়লো, ২০০৫ সালে হংকং সিটির শহরের রাস্তায় রাস্তায় নারী বেশ্যাদের বিজ্ঞাপন । তারা ট্রাপড হয়ে যৌনতাকে পেশা হিসাবে নিয়েছে নাকি স্বেচ্ছায় যৌনতা বেচতেসে, সেটা বিলবোর্ডের আলোর নিচে থাকলেও থাকতে পারে; কিন্তু একটা সরাসরি স্পষ্ট বেচাকেনার সংস্কৃতি টের পা্‌ইসিলাম স্ট্রেঞ্জার হিসাবে।

এইরকম একটা পশ্চিমা ফেনোমেনা কীভাবে কোলকাতায়, ভারত দেশের একটি প্রদেশে দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞাপন হলো-ভাবতে ভাবতে গুগলের সহযোগিতা এবং “মেইল এসকর্ট অ্যণ্ড উইম্যান সেক্সুয়ালিটি ইন ওয়েস্টবেঙ্গল, ইন্ডিয়া” সার্চ দিয়ে কোন একাডেমিক অথবা নন একাডেমিক লেখা পেলাম না। তবে কিছু সাইট পেয়েছি, যেগুলাতে মেইল এসকর্ট হিসাবে আয় রোজগারের অফার আছে ছেলেদের জন্য এবং মেইল এসকর্টদের বিজ্ঞাপন।

কোলকাতা ব্যকপেইজ নামে একটি সাইট চার বছর ধরে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে সেখানে ৭০ দিনের জন্য নিবন্ধকৃত হওয়ার অফার দেয়া হয়। এর জন্য ডিভোর্সি বা তালাকপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে চৌদ্দশ রুপী, হাউজ ওয়াইভস বা গৃহী স্ত্রীর ক্ষেত্রে ষোলশত রুপী আর দুই ক্যাটাগরীর জন্য ১৮০০ রুপী দিয়ে নিবন্ধিত হতে হবে এই সাইটটির সবচে বড় বক্তব্য আছে প্রতারিত হওয়ার কোনও সুযোগ নাই। মানে এই টাকা দিয়ে মেইল এসকর্টদের নিবন্ধিত হতে হবে এবং এরপর ৭০ দিন সে বিভিন্ন নারীর সাথে সেক্স করে ওই নারীর কাছ থেকে টাকা উপার্জন করবে। সেই টাকায় কোনও ভাগ বসাবে না কোলকাতা ব্যাকপেইজ।

ডেইলি মিরর (২১ মে ২০১৫) পত্রিকা বলছে, ব্রিটেনে গত ৫ বছরে পুরুষ যৌনসঙ্গী বা মেইল এসকর্টের সংখ্যা বেড়েছে ৩ গুন আর ফিমেইল এসকর্ট বা নারী যৌনসঙ্গীর সংখ্যা বেড়েছে এর চেয়ে আধাগুন কম, মানে আড়াইগুন। যুক্তরাজ্যের ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি এবং ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির দুই গবেষকের যৌথতায় সেক্স সার্ভিস গ্রহণ করা নারীদের ওপর গবেষণায় বলা হয়, সব বয়সী নারীই পুরুষের যৌনতা কিনছে, তবে ব্যস্ত, চাকরীজীবী নারীরা এর বেশি ক্রেতা।

আমার একের পর এক গুগল সার্চে এরপর সোনার মুদ্রার মতো ভেসে উঠলো ওজির সাইট। আমি পরিচিত হলাম দুনিয়ার এক নম্বর মেইল এসকর্টের ওয়েব সাইটে। তিনি নিজেই নিজের সাইটে লিখসেন, তিনি বিশ্বের এক নম্বর মেইল এসকর্ট। অস্ট্রেলিয় হলেও তিনি থাকেন বেশিরভাগ সময় লন্ডনে, থাইল্যাণ্ডে আছেন এসময়। তার পেইজের আপডেইট নিয়মিত হয়। তিনি শুধু নারীদের সাথে না, নারী, পুরুষ এবং কাপল- ৩ ক্যাটাগরিতে সেক্স সার্ভিস দেন।

তার সার্ভিসের বর্ননা উল্লেখ করেছেন এরকমভাবে : I’ll get hard for you, guaranteed, and stay that way. If you want me to cum, I will. If you want me to bottom, I’ll douche before you arrive.”

তার নিজের উচ্চতা এবং যৌনাঙ্গের সাইজ উল্লেখ করার পাশাপাশি উল্লেখ করা আছে, প্রতি ঘন্টা হিসাবে তার চার্জ।

পুরুষের বহুগামিতাকে সহনশীলতা দিয়ে যখন ভারতীয় সংস্কৃতি নারীর জন্য সন্তান, শ্বাশুড়ি, সংসার মেইনটেন্সের মধ্য দিয়ে এক পুরুষের প্রতি যৌনগামীতার আয়োজন করে এবং তাকে চিয়ার্স করার সংস্কৃতি জারী রাখে এবং খারাপ নারী বলতে অন্য পুরুষের সাথে শোওয়া বুঝায়-এরকম ডিসকোর্স যেখানে প্রচারিত হয় মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমে, সেখানে পশ্চিমা মডার্নিটির মতো নারীর যৌন আনন্দের জন্য মেইল এসকর্টের বিজ্ঞাপন আমাকে বিস্মিত করেছে। কিন্তু এই বিজ্ঞাপন নিশ্চিতভাবে দেখায় মেইল এসকর্টের বাজার, ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নারীর যৌনতা উদযাপনের শুধু অর্থনৈতিক না, সাংস্কৃতিক সামর্থ এবং ক্যাপিটালিজমের সেক্সুয়াল প্লেজার।
তথ্যসূত্র: দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১

শামীমা বিনতে রহমান: সাংবাদিক (উইমেন চ্যাপ্টারের সৌজন্যে)

আরও পড়ুন