বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

ইউনিয়নে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন আজ: কারও সহযোগিতা পাননি সিইসি

Union-Electionমঙ্গলবার সকাল থেকে একযোগে শুরু হয়েছে দেশের ৩৪টি জেলার ৭৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ভোটগ্রহণ।এবারই সারা দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও (সিইসি) সোমবার ভোটপূর্ব সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে এ নির্বাচনী সহিংতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি খোলাখুলিই বলেছেন, ‘নির্বাচনী সহিংসতা আমরা কমিয়ে আনতে পারছি না। কারণ অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছি না।’

সিইসি আরো বলেন, ‘কোনো কেন্দ্রে ভোট কারচুপি ও সহিংসতা হলে ওই কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়ী হবেন।’

আজ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ইউপি এলাকায় টানা ভোটগ্রহণ চলবে। এটি স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তরের সবচেয়ে বড় নির্বাচন হওয়ায় দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মাঝে এখন বিরাজ করছে উৎসব আমেজ।
সারা দেশে ব্যাপক হারে সহিংসতাও হয়েছে। নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। তারপরও গ্রামের মানুষের সঙ্গে ভোট উৎসবে যোগ দিতে শত শত মানুষ ছুটে যাচ্ছেন নিজের এলাকায়।

বার্তা সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এরই মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী এলাকায় মাঠে টহল শুরু করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), পুলিশ, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক লাখ ৮০ হাজার সদস্য। একই সঙ্গে ৩৪ জেলার ১০১টি উপজেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি বিচারিক হাকিমরাও অপরাধ তদারকিতে মাঠে রয়েছেন।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় নির্বাচনে ৭৫২ ইউনিয়নে ভোট গ্রহণের জন্য তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে ১৭টি ইউনিয়নের তফসিল বাতিল ঘোষণা করা হয়।

এ নির্বাচনে এরই মধ্যে ৫৪ জন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বিনা ভোটে নির্বাচিতরা সবাই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী।

এছাড়া প্রথম পর্বের টাংগাইল নাগরপুর উপজেলার ১১ ইউনিয়নের নির্বাচন ২৩ মার্চ এবং টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের নির্বাচন হবে আগামী ২৭ মার্চ।

এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনেক স্থানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বাধার কারণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি প্রার্থীদের নানাভাবে নির্বাচনী প্রচারকাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনে এরই মধ্যে শেষ হয়েছে সব ধরনের প্রচার। নির্বাচনী আইনানুযায়ী কোনো নির্বাচনী এলাকার ভোটগ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৩২ ঘণ্টা, ভোট গ্রহণের দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা এবং ভোটগ্রহণের দিন রাত ১২টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে নির্বাচনী এলাকায় কোনো ব্যক্তি জনসভা আহ্বান, অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান এবং কোনো মিছিল বা শোভাযাত্রা করতে বা তাতে যোগদান করতে পারবেন না। এই বিধি লঙ্ঘন করলে অন্যূন ছয় মাস বা অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

শনিবার মধ্যরাত থেকে নির্বাচনী এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল রাত থেকে ৩২ ঘণ্টা সব ধরনের যান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে ইসি। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী/তাদের নির্বাচনী এজেন্ট, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও অনুমোদিত সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তা শিথিল থাকবে।

চেয়ারম্যান পদে তিন হাজার ৩৪ জনসহ মোট ৩৬ হাজার ৪৫৬ জন প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে প্রায় সাত হাজার ৮৭টি কেন্দ্রে এক লাখ ২১ হাজার ১৯৫ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন বলে ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ব্যালট পেপারসহ সব ধরনের নির্বাচনী সামগ্রী আজ সোমবার প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ইউপিতে প্রথম ধাপে এরই মধ্যে ৫৪ জন চেয়ারম্যান, ১৭৯ জন সাধারণ সদস্য ও ৫৪ জন সংরক্ষিত সদস্য পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ২২ মার্চের ভোটে তিন হাজার ৩৪ জন চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য পদে ২৫ হাজার ৮৪৭ জন ও সংরক্ষিত পদে সাত হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী রয়েছেন। এরপর আরো পাঁচ ধাপে দেশের বাকি সাড়ে তিন হাজার ইউপিতে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

এ ধাপে সাত হাজার ৮৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোট হবে। এসব ভোটকেন্দ্রে বুথের সংখ্যা ৩৮ হাজার ৩৬টি। এ হিসাবে প্রতি কেন্দ্রে একজন করে সাত হাজার ৮৭ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, প্রতি বুথে একজন করে ৩৮ হাজার ৩৬ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং প্রতি বুথে দুজন করে ৭৬ হাজার ৭২ জন পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মোট ভোটগ্রহণ করবেন এক লাখ ২১ হাজার ১৯৫ জন কর্মকর্তা। এতে পুরুষ ভোটার ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৬৯ জন এবং নারী ভোটার ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৪ জন।

নির্বাচনের কারণে ৭৩৪টি ইউপিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে নির্বাচনী এলাকায় সব অফিস বন্ধ থাকবে।

ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রথম ধাপে ২২ মার্চ ৭৩৪টি, ২৩ মার্চ নাগরপুরে ১১টি এবং ২৭ মার্চ টেকনাফের দুটি ইউপির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ৩১ মার্চ, তৃতীয় ধাপে ২৩ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ৭ মে, পঞ্চম ধাপে ২৮ মে ও ষষ্ঠ ধাপে ৪ জুন ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

কারও সহযোগিতা পাইনি: সিইসি

সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোট শুরুর আগের দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘নির্বাচনী সহিংসতা আমরা কমিয়ে আনতে পারছি না। কারণ অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছি না।’

শেরেবাংলা নগরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে আজ সোমবার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিইসি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘কোনো কেন্দ্রে ভোট কারচুপি ও সহিংসতা হলে ওই কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়ী হবেন।’

আজ মঙ্গলবার থেকে প্রথম ধাপে শুরু হবে ইউপি নির্বাচন।

কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমরা অন্য ডিপার্টমেন্টের ওপর নির্ভর করি। অন্য ডিপার্টমেন্টের লোকজনকে আমাদের রিটার্নিং কর্মকর্তাও করতে হয়েছে। তাঁদের আমরা খুব অল্প সময়ের জন্য ট্রেনিং দেই। তাঁদের ওপর আমাদের তেমন কর্তৃত্বও নেই। সে জন্য কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা কিংবা, যে মাপের সেবা চাই তা পাই না। এ জন্য এসব ঘটনা ঘটছে।’

সিইসি বলেন, ‘উন্নত দেশের তুলনায় নির্বাচনের সহিংসতা আমাদের ও প্রতিবেশী দেশে বেশি। এটাকে আমরা কমিয়ে আনতে পারছি না। এটা চরিত্রগত বিষয়। আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটা দূর করতে সময় লাগবে। এই ট্রাডিশন ও কালচার চেঞ্জ হতে সময় লাগবে। এ জন্য প্রতিটি রাজনৈতিক দল, প্রার্থীর ও তাঁদের সমর্থকদের সহযোগিতা লাগবে।’

‘ভোট চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্ব করলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো কেন্দ্রে ভোট কারচুপি ও সহিংসতা হলে ওই কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়ী হবেন। আপনারা আপনাদের সর্বশক্তি দিয়ে সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।’

‘এখন নির্বাচন অর্থকেন্দ্রিক হয়ে গেছে’ উল্লেখ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘যার ফলে যার গায়ে জোর বেশি তিনিই নিজেকে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি মনে করেন। এগুলোর সব সমাধান হবে ভোটারদের রায়ে। ভোটাররা ভালো ব্যক্তি নির্বাচিত করবেন। এভাবেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি ভোটার যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্ভয়ে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে জন্য পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ বিজিবি, র‍্যাব, কোস্টগার্ড ও আনসারের বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন থাকবে।’

সিইসি বলেন, ‘আগামীকালের নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য জেলা, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে পযাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরো বাড়ানো হবে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে থাকবেন পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব, এপিবিএন, আনসার ব্যাটালিয়ন ও আনসার-ভিডিপির প্রহরা। টহলে থাকবে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থাকবেন।’

নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী, তাঁর সমর্থক, ভোটার ও অন্য সবার সহযোগিতা কামনা করছে বলেও উল্লেখ করেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ।

বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকানোর নির্দেশ দিয়ে সিইসি বলেন, ‘বহিরাগতরা যেন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে এলাকায় প্রবেশ না করে। অবৈধ অস্ত্র যেন ব্যবহার না করে। ভোটারা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন তার জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

সার্বিক পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে আছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলাসহ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী, মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ ও নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম।

আরও পড়ুন