বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক: চুরি যাওয়া অর্থ নিয়ে গোলকধাঁধা

138322_1এটি কোনো প্রচলিত চুরি ছিল না। অস্ত্র হাতে মুখোশ পরিহিত কোনো ডাকাত এখানে নেই। বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থও এখানে নেই। ফেব্রুয়ারিতে কেউ বা কোনো একটি সংঘ আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা করে। তারা এর মধ্য থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরাতে সমর্থ হয়। আর এখন এ পরিমাণকেই ইতিহাসের অন্যতম বড় চুরির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

দুই সপ্তাহ ধরে ফিলিপাইনের সিনেট একের পর এক ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও কূটনীতিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, এটি জানতে যে, ওই অর্থ কোথায় গেছে। এখন পর্যন্ত এর মূল কুশীলব সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে। কিন্তু গত মঙ্গলবার ফিলিপাইনের তদন্তকারীরা দুজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছেন। এর একজন দেশটির ক্যাসিনোয় জুয়ার আয়োজন করেন। অন্যজন একটি ক্যাসিনোর মালিক।

ঠিক কত দিন ধরে অপরাধীরা চুরির এ পরিকল্পনা করেছিল, তা এখনো জানা যায়নি। তবে ফিলিপাইনের সন্দেহভাজন ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর কয়েকটি গত বছরের মে মাসে খোলা হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম শুক্রবার অপরাধীরা নিউইয়র্ক ফেডে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের জন্য ৩৫টি অনুরোধ পাঠায়। এর মধ্যে চারটি অনুরোধ কার্যকর হয়।

এর ফলে ফিলিপাইনে স্থানান্তর হয় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর শ্রীলংকার একটি ব্যাংকে ২ কোটি ডলার পাঠানোর অন্য একটি অনুরোধ বানান ভুলের কারণে স্থগিত করা হয়। উল্লেখ্য, অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশের মতোই বাংলাদেশের ছুটির দিন শুক্রবার। রবিবার কর্মদিবস শুরুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে এসব অনুরোধ-বিষয়ক ফেডের বার্তা সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্তা প্রেরণ কাঠামো ভেঙে পড়ায় নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে ফ্যাক্স ও ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যাংকটি। যুক্তরাষ্ট্রে ওইদিন ছুটির দিন থাকায় সোমবারের আগে ফেডের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যর্থ হন কর্মকর্তারা।

দুই সপ্তাহ আগে ফিলিপাইনের সিনেট জানতে পারে, দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) মাধ্যমে ওই অর্থ দেশটিতে প্রবেশ করেছে। ব্যাংকের গোপনীয়তার ক্ষেত্রে শক্তিশালী নীতি অনুসরণের ক্ষেত্রে ফিলিপাইন বিশ্বের মধ্যে অন্যতম। দেশটিতে ক্যাসিনোগুলো সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে জবাবদিহিতায় বাধ্য নয়।

সপ্তাহ শেষে ফিলিপাইনের ব্যাংকগুলো খোলার পর আরসিবিসির সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দাগুইতো চারটি অ্যাকাউন্ট স্থগিতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধটি পান। কিন্তু তিনি তা এড়িয়ে যান। ওই চার অ্যাকাউন্টেই চুরিকৃত অর্থ গিয়েছিল।

আইনজীবীদের বয়ানে জানা গেছে, দাগুইতো এর বাইরে ব্যবসায়ী উইলিয়াম সো গোর অ্যাকাউন্টেও অর্থ স্থানান্তর করেন। এর পর তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের মাধ্যমে ওই অর্থকে স্থানীয় মুদ্রা পেসোয় রূপান্তর করে ক্যাসিনোয় পাঠান। এর মধ্যে গো আরসিবিসিতে থাকা অ্যাকাউন্টটি অস্বীকার করেছেন। তিনি এ অর্থ চুরির ঘটনায় যেকোনো ধরনের সংযুক্তির বিষয়টিও অস্বীকার করেন।

ফিলরেমের এক প্রতিনিধি সিনেটকে জানিয়েছেন, দাগুইতো তাদের ওই অর্থ দুটি ক্যাসিনোয় স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ওয়েইক্যাং জু নামে এক ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টেও অর্থ স্থানান্তর করতে বলেন বলে জানায় ফিলরেম।

চুরিকৃত অর্থের মধ্য থেকে জুর অ্যাকাউন্টে জমা হয় ৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার স্থানান্তর হয় সোলেয়ার নাম ক্যাসিনোয়। বাকি অর্থ যায় ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার নামক কোম্পানির মালিকানাধীন আরেকটি ক্যাসিনোয়। এ কোম্পানির মালিক কিম অং, যাকে সিনেটর সার্জিও ওসমেনা থ্রি ‘মিসিং লিংক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ওসমেনা সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় একজন মূল পরিকল্পনাকারী রয়েছেন। আর এ মুহূর্তে কিম অংকেই তা মনে হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বিষয়টি এক মাস ধরে গোপন রাখেন। তিনি অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলে উপস্থিত হতে ফিলিপাইনে গেলে বিষয়টি প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ফেডকে এ অর্থ স্থানান্তরের জন্য দোষারোপ করেছে।

আরও পড়ুন