নাট্যকর্মী ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে দেশজুড়ে ক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। চলছে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচী।
রাজধানীর শাহবাগসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ-সামাবেশ করছেন শিক্ষার্থী, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্রকর্মী, কবি-সাহিত্যিক, মানবাধিকারকর্মী, ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বুধবার থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ৬৮টি মানবাধিকার সংস্থা সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি মানববন্ধন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ, সিলেট, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা শিগগিরই তনুর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়।
রোববার (২০ মার্চ) রাতে তনু হত্যাকাণ্ডের পর সোমবারই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে কুমিল্লাবাসী। এরপর রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তনু হত্যার প্রতিবাদ। এছাড়া গণজাগরণ মঞ্চ রোববার (২৭ মার্চ) কুমিল্লা অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৪৮ মিনিটের মধ্যে খুনিদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
এদিকে ঘটনার পর তনুর বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের নামে একটি হত্যা মামলা করেন। তবে এখন পর্যন্ত খুনের কারণ বা কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
শুকবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তনুর পরিবারের সদস্য ও এক চাচাত বোনকে কুমিল্লার মুরাদনগরের বাড়ি থেকে নিয়ে যায় র্যাব। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তারা ওই বাসায় রয়েছেন।
এ নিয়ে তনুর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনসহ গ্রামের মানুষের মধ্যে এক ধরণের ভীতি কাজ করছে।
এ ব্যাপারে অবশ্য র্যাব-১১ এর কুমিল্লা ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-২ এর অধিনায়ক মেজর খোরশেদ আলম বলেন, তনু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে শুক্রবার রাতে তনুর মা ও আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে তাঁদের ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের বাসায় রেখে আসা হয়েছে।
ঘটনার ছয়দিনেও তদন্তের অগ্রগতি না হওয়ায় ও ঘটনার কোন ক্লু না পাওয়ায় ক্ষোভ সঞ্চার হয়েছে বিভিন্ন মহলে। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল।
ঘটনাটির তদন্ত করছে স্থানীয় পুলিশ ও ছায়া তদন্ত করছে র্যাব। এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আইএসপিআর ঘটনার তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। সর্বশেষ শনিবার বিকেলে ঘটনার অধিকতর তদন্তের জন্য তদন্ত ভার থানা পুলিশ থেকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। শনিবার রা্জারবাগ পুলিশ লাইনে তিনি বলেন, এ ঘটনায় গোয়েন্দারা কাজ করছে। আমরা অনেক বড় বড় ঘটনার রহস্য বের করেছি। এটিরও রহস্য উদঘাটন হবে। হয়তো একটু সময় লাগছে।
তদন্তের ব্যাপারে ‘শিগগিরই ভালো কোনো খবর দিতে পারব’ বলে মন্তব্য করেছেন র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে র্যাব কাজ করছে। আমরা আশাবাদী, শিগগিরই হয়ত ভালো কোনো খবর দিতে পারব।
কুমিল্লা জেলার ডিবির ওসি একেএম মঞ্জুর আলম পূর্বপশ্চিমকে জানান, এ হত্যা মামলা অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরিই এর অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে।
তিনি আরও জানান, এ মামলায় তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে শুক্রবার রাত থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি। খুব শিগগিরই রহস্য উদ্ঘাটন হবে।
কিন্তু প্রশাসনের এ আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছে না বিভিন্ন মহল। তারা বলছেন, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিচার না হলে তনুর মতো অনেককেই এ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন জানান, ‘কোনো ছলাকলা নয়। শিগগিরই এ হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মিডিয়াকে আরও সোচ্চার হতে হবে।’
বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আনিসুল হক বলেন, ‘যেসব তরুণ এ জঘন্য হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে, শাস্তি দাবি করছে, সব জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছে- তারা যেন ন্যায়বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত এবং আন্দোলন বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকে। কারণ এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়াটা জরুরি।’
তনু হত্যার প্রতিবাদে সবাইকে প্রতিবাদী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক অজয় রায়। তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘তনুর ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়ে নীরব থাকছেন যারা, তারা মনে রাখবেন- তাদের কন্যা অথবা বোন ধর্ষণের শিকার হলে সমাজটা এ রকমই নীরব থাকবে। তবে আজ যারা প্রতিবাদ করেছেন- সেদিনও তারা আপনাদের নীরবতার কথা মনে না রেখে আবারও প্রতিবাদী হবে। এটুকু মনে রাখবেন, আপনাদের প্রতিবাদহীনতা সমাজের অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে- আপনার পরিবার-পরিজনও কিন্তু নিরাপদ নয়।’
তনু হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পেসার তাসকিন আহমেদও। নিজের এ দুঃসময়েও বুধবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক ফ্যান পেজে ‘তনু হত্যার বিচার চাই’লেখা সংবলিত একটি ছবি আপলোড করেন তাসকিন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘ইট’স ফিল রিয়েলি স্যাড’।
তনু হত্যাকাণ্ড ও এর প্রতিবাদে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে নারী ও মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, ‘কেউই সন্দেহ বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তনু হত্যাকাণ্ডটি যেহেতু একটা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে ঘটেছে, তাই এ ঘটনার দায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এড়াতে পারে না।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘সমাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে বারবার আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ সমাজিক অবক্ষয় দূর করতে সমাজের সব পর্যায়ের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।’
উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ সন্ধ্যায় টিউশন শেষে বাসায় ফেরার পথে সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর ময়নামতি সেনানিবাসের অলিপুর এলাকায় একটি কালভার্টের কাছ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।


