পুলিশের গুলিতে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুজন মৃধার পরিবারের সদস্যদের জন্য কোনো সান্ত্বনাই মিলছে না। সুজনের আশা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। তার দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা স্বপ্ন দেখেছিলেন সুজন একদিন পরিবারে স্বচ্ছলতা আনবে।
মাদারীপুরে ইউপি নির্বাচনে বৃহস্পতিবার ভোট গণনা নিয়ে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সুজন মৃধা (২১)।
সদর উপজেলার বুরাইল ইউনিয়নের দক্ষিণ বিরাঙ্গল গ্রামের বাচ্চু মৃধার ছেলে তিনি।
বুরাইল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য পদে দাদাকে (বাবার চাচা) ভোট দিতে বুধবার সুজন বাড়ি এসেছিলেন।
ভোটের দিন সন্ধ্যায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদ হাসান, সালমা আক্তারসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুজনের দাদা মোতালেব মৃধা সদস্য পদে মোরগ মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেছেন।
প্রথমবার ভোট গণনার পর কেন্দ্র থেকে বলা হয়, মোরগ মার্কা জিতে গেছে। কিন্তু তার ৫ মিনিট পর আবার ঘোষণা দেওয়া হয় প্রতিদ্বন্দ্বী আইয়ুব আলী ফকিরের ফুটবল মার্কা বিজয়ী হয়েছে।
এরপর দুপক্ষের দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক শোরগোল ও হইচই পড়ে যায়।
এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে সুজন নিহত হন।
নিহত সুজনের বাবা বাচ্চু মৃধা আহাজারি করতে করতে বলেন, “আমার এই ছেলের স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। পুলিশ আমার বাবারে গুলি করে সব স্বপ্ন শেষ কইরা দিল।
“ছেলেরে মানুষ করতে আচার-বাদাম বেচা থেকে শুরু করে কী না করেছি।”
মাদারীপুর মডেল থানার ওসি জিয়াউল মোর্শেদ ওই কেন্দ্রে কর্তব্যে থাকা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলেন, “ব্যালট পেপার নিয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা যখন কেন্দ্র ছেড়ে চলে আসছিলেন তখন ওই ছেলে ব্যালট পেপার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই দুর্ঘটনা ঘটেছে।”
এ ব্যাপারে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. সরোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের কাছে এই ঘটনা নিয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
ঘটনার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ধুরাইল ইউনিয়নের দক্ষিণ বিরঙ্গল নূরানী মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষে সন্ধ্যায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আয়ুব আলীকে জয়ী ঘোষণা করেন। এ ফলাফল নিয়ে সুজনের চাচাতো দাদা সদস্য প্রার্থী আবদুল মোতালেব মৃধা সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছে পুনরায় গণনার দাবি করেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। এ সময় পুলিশ সুজনকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে সুজন আহত হলে তাঁকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে আনা হয়। রাত ৮টার দিকে তিনি মারা যান। সংঘর্ষের সময় আহাদুজ্জামান মৃধা ও কাজল আকন নামের দুই যুবক গুলিবিদ্ধ হয়। রাতে তাঁদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘সুজন ও আমরা পাঁচ-ছয়জন বন্ধু মিলে ফলাফল শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা গল্প করছিলাম। এর মধ্যেই চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। পুলিশ আমাদের গতিরোধ করে গুলি ছুড়তে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে সুজনসহ কয়েকজন মাটিতে পড়ে যায়। সুজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সে মারা যায়।’
সুজন মিঠাপুর এলএন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও নটর ডেম কলেজে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। সুজন বাবা-মায়ের বড় সন্তান। সুজনের বাবা বাচ্চু মৃধা অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল সুজন লেখাপড়া শেষ করে বড় কোনো চাকরি করে সংসারের দুঃখ ঘোচাবেন। সেই স্বপ্ন এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গেল পুলিশের গুলিতে।


