বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী-অপরাধী

Daffodil-s1রাজধানীর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র পরিচয়ে প্রায় দু’শ  আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ও প্রতারক ভর্তি হয়ে দীর্ঘদিন যাবত নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তুরস্ক, নাইজেরিয়া সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও উত্তর কোরিয়া থেকে তারা এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ না মেনেই এসব বিদের্শী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন বিদেশী শিক্ষার্থীর জঙ্গী যোগাযোগের ঘটনা ধরা পড়ার পর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এই মর্মে সুপারিশ করেছে যে, বিদের্শী শিক্ষার্থী ভর্তির আগে পাসপোর্টের খোজঁখবর নেওয়া এবং নিকটতম থানায় তথ্য দিয়ে রাখতে হবে। কিন্ত ড্যাফোডিল কর্তৃপক্ষ এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার ধার ধারে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

দৈনিক শিক্ষা ডটকমের এক প্রশ্নের জবাবে সোমবার (৪ এপ্রিল) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. প্রকৌশলী এ.কে.এম. ফজলুল হক বলেন, ‘নরমাল প্রসেসে তাদের ভর্তি করা হয়েছে’।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়টির মালিকানায় রয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

বিভিন্ন ধরণের পুরস্কার, পদক বা লটারি পাওয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে ছাত্র পরিচয়ধারী এই বিদেশি প্রতারকরা। মোবাইল ফোনে ও ই-মেইলের মাধ্যমে বার্তা চালাচালি করে তারা ফাঁদ সাজায়। পরে বিভিন্ন ধরনের চার্জ পরিশোধের কথা বলে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির নাইজেরীয় চার শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে নানা তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

বর্তমানে প্রায় দু’শ বিদেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে বলে জানিয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হাবিব কাজল বলেন, ‘ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী গ্রেফতারের বিষয়ে কোন তথ্য জানা নেই। আমরা সবসময় বিদেশি শিক্ষার্থীদের নজরদারির মধ্যে রাখি। তারপরও যদি কোন শিক্ষার্থী ক্রাইম করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রাজধানীর শাহআলী এলাকা থেকে নাইজেরীয় চার তরুণ ও তাদের বাংলাদেশি এক নারী সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতারকৃত নাইজেরীয় চার তরুণ জানিয়েছে, তারা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ছাত্রত্বের আড়ালে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে।

আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় রোববার (৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় শাহআলীর একটি ফ্ল্যাট থেকে তাদের গ্রেফতার করেন পিবিআই সদস্যরা। এর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতারিত এক ব্যক্তি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। বাদীর ওই অভিযোগ ধরে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এরপর অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত চার নাইজেরিয়ান তরুণ হলেন- মোহাম্মদ আউয়ালু আদামু (২৫), ওবায়দুবাহিমেন জেমস (২৯), ওলোনোফেমি ডানিয়েল (৩১), মো. আদামু (২৫) ও তাদের বাংলাদেশি নারী সহযোগী জয়ন আরা রিয়া (১৮)।

সোমবার সকালে পিআইবি’র ধানমণ্ডির অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন (এসআইঅ্যান্ডও) ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আহসান হাবীব পলাশ এসব তথ্য জানান।

এই চক্রটি পঞ্চগড়ের এক ব্যক্তির সঙ্গেও এই প্রতারণা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, জানা গেছে গ্রেফতারকৃতরা সবাই বেসরকারি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে কেউ বৈধ আবার কেউ অবৈধভাবেও বাংলাদেশে বসবাস করছে। তাদের বিষয়ে আরও তদন্ত করা হচ্ছে।

Daffodil-sআহসান হাবীব বলেন, নাইজেরিয়ানরা এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার (স্ক্যাম) মাধ্যমে অর্থআত্মসাতের কারণে আগে থেকেই পরিচিত। বাংলাদেশেও তারা এ ধরনের প্রতারণা করে বেড়ায়। এমন একটি চক্রকে আমরা গ্রেফতার করেছি। প্রতারণার শিকার এক ব্যক্তি পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তিনি এই প্রতারক চক্রটিকে ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা দিয়েছেন। তাকে চক্রটি বলেছিল তিনি কয়েকশ পাউন্ড ও ডলারের কোকাকোলা পুরস্কার পেয়েছেন। এরপর তার কাছ থেকে কয়েক দফায় ব্যাংকের মাধ্যমে এই টাকা আত্মসাৎ করে। তিনি শেষে বুঝতে পেরেছেন যে তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এরপরই তিনি মামলা করেন। পিবিআই মামলাটি তদন্ত শুরু করে এবং চক্রটিকে গ্রেফতার করে।

আহসান হাবীব বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অংকের টাকা আদায় করেছে এই চক্রটি।

পিবিআই’র এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতারকৃতরা মূলত মোবাইল ও ই-মেইলের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে গ্রাহকদের পুরস্কার পাওয়ার কথা জানায়। তারা সাধারণত কোকাকোলা লটারি, ইউনাইটেড ন্যাশন্স পুরস্কার, আইসিসি টুর্নামেন্ট পুরস্কার, ইউএনডিপি পুরস্কারসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে বার্তা পাঠায়। সেখানে একটি ই-মেইল আইডি পাঠায়। এরপর তাদের মধ্যে মেইল চালাচালি হয়। এরপর ওইসব ব্যক্তিদের কাছ থেকে পুরস্কার হাতে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সার্ভিস চার্জের কথা বলে টাকা চাওয়া হয়। যেমন কাস্টমস ডিউটি, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় ফি, মানি লন্ডারিং মামলায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ভীতি, ফিসিং (ভুয়া ওয়েব পেজ), সিওটি (কস্ট অব ট্রান্সফার), ৫ শতাংশ ভ্যাট ও এন্টিটেররিজমের কথা বলে টাকা চাওয়া হয়।

তিনি বলেন, বিদেশিদের কথায় বাংলাদেশি মানুষের আস্থা থাকায় সেই সুযোগটি নেয় প্রতারক চক্রটি। তাদের দলে বাংলাদেশের নারী সদস্যরাও রয়েছেন। যারা প্রলোভনের ফাঁদ তৈরি করেন।

আরও পড়ুন