বিশ্বের ক্ষমতাধর ধনী আর সেলিব্রেটিদের কর ফাঁকি ও সম্পদ গোপনের বিপুল পরিমাণ তথ্য ফাঁস হয়েছে। সাংবাদিকদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় পানামাভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্যগুলো ফাঁস হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত সহায়তা গ্রহণকারীদের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ গোপন নথি প্রকাশ হয়ে গেছে। আন্তর্জাাতিক গণমাধ্যমগুলো একে আখ্যায়িত করছে ‘ক্রাইম অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে।
ফোনসেকার ডাটাবেজ (তথ্যভাণ্ডার) থেকে চুরি করা নথিগুলো জার্মান পত্রিকা Süddeutsche Zeitung এ প্রকাশিত হয়েছে। তবে তারা এখনো সম্পূর্ণ তথ্য পত্রিকায় ছাপেনি। নথিগুলো হাতে পাওয়ার পরে তারা সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের (আইসিআইজে) কাছে পাঠিয়েছে।
ফাঁস হওয়া নথিগুলো থেকে জানা যায়, সাবেক ও বর্তমান ৭২ জন রাষ্ট্রপ্রধান তাদের দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। ফাঁস হওয়া নথিতে উঠে এসেছে ফিফার দুর্নীতির প্রসঙ্গও। এ থেকে জানা গেছে, পৃথিবীর নানান দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা বিভিন্ন কৌশলে কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের সম্পদ গোপন রাখছেন।
সম্পদ লুণ্ঠনকারী বর্তমান ও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে রয়েছেন মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক, লিবিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। এছাড়া এক ব্যাংকের মাধ্যমে অন্তত প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচারের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগীও রয়েছেন। বলিউডের তারকা অমিতাভ বচ্চন এবং ঐশ্বরিয়া রায়ের নামও রয়েছে তালিকায়। এছাড়া আছেন তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি।
ফাঁস হওয়া নথিগুলোর মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেনকো, ইরাকের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী আয়াদ আলাওয়ি, মিশরের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের ছেলে আলা মুরাবক এবং আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমান্ডার গানলা উগসন রয়েছেন। আর চীনের ক্ষমতাসীন দলের সাবেক-বর্তমান অন্তত ৮ জনের অবৈধ অথবা গোপন সম্পদ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। নথিতে রয়েছে ব্রিটিশ রক্ষণশীল এমপি, রাজনীতিবিদের গোপন সম্পদের কথাও।
অর্থ পাচার, কর ফাঁকি এবং বিভিন্ন রকম নিষেধাজ্ঞাকে ফাঁকি দিতে এই আইনি প্রতিষ্ঠানটি তার মক্কেলদের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তারা গত ৪০ বছর ধরে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
ধনী ও ক্ষমতাবানেরা কত কৌশলে কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের সম্পদ লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখে সেই কথা প্রকাশ্যে এসেছে এই ব্যাপক সংখ্যক নথি ফাঁসের ঘটনায়। দুইশ দেশ ও অঞ্চলের বর্তমান ও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, খেলোয়াড়, অভিনেতা, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকসহ সব মিলিয়ে ২ লাখ ১৪ হাজার লেনদেনের ঘটনা রয়েছে মোসাক ফনসেকার তালিকায়। আর রয়েছে ১৪ হাজার ১৫৩ জন ব্যক্তির নাম, যার মধ্যে ১৪০ জনের বেশিই রাজনীতিবিদ।
এই নথিগুলোই প্রমাণ দিচ্ছে, মোসাক ফনসেকা তার মক্কেলদের অর্থ পাচার ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি পরামর্শ দিয়েছে। গত ৪০ বছর ধরে কোনো প্রকারের কোনো সমস্যা বা সংকট বা নিন্দা ছাড়াই তারা এটি পরিচালনা করে আসছে।
এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) পরিচালক জেরার্ড রাইল বলেন, গত ৪০ বছর ধরে মোসাক ফনসেকা তার দৈনন্দিন যেসব কাজকর্ম করেছে সেগুলোর নথি রয়েছে এই ফাঁস হওয়া ডকুমেন্টগুলোয়।
উল্লেখ্য, মোসাক ফনসেকা নামের প্রতিষ্ঠানটি পানামার একটি আইনি প্রতিষ্ঠান। এরা গোপনীয়তা রক্ষাকারী হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম সেরা। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁস হওয়া নথিপত্রগুলোই ‘পানামা পেপারস’ নামে পরিচিত। ১৯৭৭ সালে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক আইনের অধীনে এটি প্রতিষ্ঠা করেন পানামার দুই নাগরিক জার্গেন মোসাক ও র্যামন ফনসেকা।


