শিক্ষা আইনের খসড়ায় শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়েছে গত রোববার। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে পাঠানো প্রায় অর্ধশতাধিক মতামত পড়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। শিক্ষাবিদরা কোচিং সেন্টার বন্ধ করা এবং সহায়ক, প্রস্তুতিমূলক বা নোট-গাইড বই প্রকাশ নিষেদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুততার সঙ্গে শিক্ষা আইন পাসের পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পাঠানো মতামতে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হলো শিক্ষা আইনের খসড়ায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর জেল ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান নির্ধারণ করতে হবে। গাইড বই ও নোট বইসংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে সহায়ক পুস্তিকা প্রকাশকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তা না হলে সহায়ক পুস্তিকা নামে নোট বই বা গাইড বই প্রকাশ সম্প্রসারিত হবে। এ ক্ষেত্রেও আইন অমান্য করলে পাঁচ বছরের জেল ও ২৫ লাখ টাকার জরিমানার বিধান করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির স্থলে সরকার কর্তৃক টিউশন ফি নির্ধারণ করার বিধান রাখতে হবে। শারীরিক শাস্তি বন্ধের বিধানে তিন মাসের স্থলে এক বছরের জেল নির্ধারণ করার পক্ষেও সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন) আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, ‘মতামত প্রদানের সময় আর বাড়ানো হবে না। আমরা এবার অনেক মতামত পেয়েছি। এখন আমরা মন্ত্রী মহোদয়ের নেতৃত্বে গ্রহণযোগ্য মতগুলো পর্যালোচনা করব। সেগুলোর আলোকে আইনের খসড়া পরিমার্জন করা হবে। এরপর তা মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হবে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে জাতীয় সংসদে যাবে।’
খসড়া শিক্ষা আইন-২০১৬ থেকে জানা যায়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত বই ছাড়া অন্য কোনো বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না। এই বিধান লঙ্ঘন করলে প্রকাশক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া শিক্ষকদের এমপিও (বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ) স্থগিত, কর্তন বা বাতিলের কথাও বলা হয়েছে খসড়া আইনে। এনসিটিবি কর্তৃক পাণ্ডুলিপির অনুমোদন নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বা প্রকাশক কেবল সহায়ক শিক্ষা উপকরণ বা সহায়ক পুস্তক বা ডিজিটাল শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রকাশ করতে পারবে। কোনো নোট-গাইড প্রকাশ করতে পারবে না। আর প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং সেন্টার বন্ধে আইনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কেউ তা না মানলে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষনীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘আমরা আমাদের মতামত জানিয়েছি। কোচিং সেন্টার সরকারকে বন্ধ করতে হবে। আর এ জন্য শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা ও পাঁচ বছরের জেলের বিধান রাখতে হবে। কেউ বলল আমি ভালোভাবে সহায়ক বা প্রস্তুতিমূলক বই বের করছি, সেটা তো হবে না। শুধু এনসিটিবিই নয়, একটি প্যানেল করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এটা লাগবে কি না। আমাদের প্রজন্মকে নোট-গাইড দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরাও নোট-গাইডের সাহায্য নিচ্ছেন। আমরা সহায়ক বই বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে মত দিয়েছি।’
জানা যায়, নোট-গাইডের আদলেই এখন বের হচ্ছে সহায়ক বা প্রস্তুতিমূলক বই। এমনকি এ ধরনের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এনসিটিবির কোনো অনুমতিও নিতে হয় না। ২০০৯ সাল থেকে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হলেও সহায়ক বইয়ের দাপটেই সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও মূল বই না পড়ে কিনছে সহায়ক বই। এমনকি পাবলিক পরীক্ষায়ও শিক্ষকরা সহায়ক বই থেকে প্রশ্ন করছেন।
অথচ খসড়া শিক্ষা আইনে সহায়ক বই প্রকাশে এনসিটিবির অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। তারা আইনের সংশ্লিষ্ট উপধারা সংশোধন করে নিজেরা নিজেদের মতোই অনুমোদনহীন নোট-গাইড বা সহায়ক বই বের করতে চায়। এ ব্যাপারে তারা এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, লাইব্রেরি বন্ধ রাখার মতো কর্মসূচি পালন করেছে। আগামী সোমবারও তারা বইয়ের দোকান বন্ধ রেখে মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, ‘বেসরকারি প্রকাশকরা যাতে স্বাধীনভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিকসহ সব স্তরের সহায়ক গ্রন্থ প্রকাশ ও বাজারজাত করতে পারেন সে লক্ষ্যে একটি মানসম্মত শিক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছি। প্রস্তাবিত আইনে নোট-গাইডের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শাস্তির যে ধারা আছে তাও বাতিল করতে হবে।’
নাম প্রকাশ না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যেসব মতামত পেয়েছি তাতে বিশেষ করে কোচিং ও নোট-গাইড বন্ধে শাস্তির বিধান আরো কঠোর রাখতে বলা হয়েছে। সুপারিশ আমলে নেওয়া হলে এখন যে বিধান রাখা হয়েছে শাস্তি এর চেয়েও বাড়তে পারে।’
প্রসঙ্গত, ২০১১ সাল থেকেই শিক্ষা আইন নিয়ে কাজ শুরু করে মন্ত্রণালয়। এরপর তিনবার এই আইনের খসড়ায় মতামত চাওয়া হয়। তিন দফায় মতামত জমা পড়লেও কর্তৃপক্ষ চতুর্থ দফায় গত ৩ এপ্রিল ফের মতামত আহ্বান করে। এ জন্য সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ খসড়াটি আগের তিনবারের চেয়েও অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।


