বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের বিসিএস ২৬ ক্যাডারের পদভিত্তিক বেতন-স্কেল পুনর্বিন্যাসের জন্য ১৪ সপ্তাহের সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার ১২ সপ্তাহ চলে গেলেও এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অগ্রগতি হয়নি। উল্টো সমস্যা সমাধানের নামে বিভিন্ন ক্যাডারে আরও জটিলতা পাকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ‘প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির (বিসিএস ২৬ ক্যাডার) নেতারা। এজন্য অষ্টম বেতন কাঠামোয় ‘বঞ্চনা’র ইস্যুতে ফের লাগাতার আন্দোলনের যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন ২৬ ক্যাডারের নেতারা।
এ ব্যাপারে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য এসএম গোলাম কিবরিয়া রবিবার বলেছেন, ‘সচিব সভা কমিটির সিদ্ধান্ত (১২ জানুয়ারি) অনুযায়ী ১৪ সপ্তাহের মধ্যে আমাদের সকল দাবি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি_ এখন পর্যন্ত ১৪ সপ্তাহের পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন কাজই হয়নি। এসব দাবি পূরণের জন্য বিভিন্ন অধিদফতর যেসব প্রস্তাব নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে, সেগুলো কাঁটছাট করা হচ্ছে, কোয়ারি (আরো তথ্য) ইত্যাদি চেয়ে বিলম্ব করা হচ্ছে।’
অষ্টম বেতন কাঠামো থেকে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের প্রতিবাদে আন্দোলন করে আসছিল বিসিএস সমন্বয় কমিটি (২৬ ক্যাডার)। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সচিব সভা কমিটি বিভিন্ন ক্যাডারের সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে গত ১২ জানুয়ারি এক সভায় বেশকিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামত/সুপারিশ উত্থাপন করেন। ওই সভায় সচিবরা ১৪ সপ্তাহের কর্মপরিকল্পনা বা টাইমফ্রেম গ্রহণ করেন।
এসব কর্মপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো: টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের কারণে যেসব ক্যাডার কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাদের পদভিত্তিক বেতন-স্কেল পুনর্বিন্যাস করে ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া। এ বিষয়ে বিভিন্ন অধিদফতরে কর্মরত ক্যাডার কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বিদ্যমান সমস্যা, প্রশাসনিক জটিলতা, পদ-আপগ্রেডেশন ও এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। এভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ক্যাডার কর্মকর্তাদের সমস্যা বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানোর কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পাঠালেই কেবল তা নিয়ে আমরা অগ্রসর হবো। কয়েকটি মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় এখনও প্রস্তাব পাঠায়নি। তাছাড়া ১৪ সপ্তাহের পরিকল্পনার সময় এখনও শেষ হয়নি।’
প্রস্তাবনায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য ক্যাডারের পক্ষ থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল, যা পরবর্তীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে তাতে বিভিন্ন বিষয় কাঁটছাট করা হয়েছে। এতে মৎস্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এদিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের গুরুত্বপূর্ণ সব পদেই বহাল আছেন প্রশাসন ও চিকিৎসা ক্যাডার কর্মকর্তা। এ অধিদফতরে বিসিএস পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারের কোন কর্মকর্তা না থাকায় তাদের প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে না। মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত ও ক্যাডার কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী পরিকল্পনা ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের মধ্যে প্রচলিত ট্রেন্ট পিরামিড বা পদোন্নতির প্রচলিত গতি বজায় রাখার কথা।
আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই কৃষি, অডিট (অর্থ), ইকনোমিক ক্যাডারের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রস্তাবনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে কোন তৎপরতা নেয়া হচ্ছে না। আজ না, কাল সভা হবে হচ্ছে করে এসব বিষয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে বিসিএস ২৬ ক্যাডারের নেতারা জানিয়েছেন। এসব কারণে কবে নাগাদ বিসিএস ২৬ ক্যাডারের দাবিসমূহ মন্ত্রিসভায় উত্থাপন হবে- তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছেন কর্মকর্তারা।
সচিব সভার কর্মপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত
ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহ গত ৭ জানুয়ারি থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্যাডার পদ বিন্যাসের বিষয়টি পর্যালোচনাপূর্বক পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ক্যাডার পদ ভিত্তিক বেতন-স্কেল পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত প্রস্তাব চার সপ্তাহের মধ্যে বিচার বিশ্লেষণ করে তাদের মতামত ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহে প্রেরণ করবে। ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহ ক্যাডার পদ বিচার-বিশ্লেষণ করে তিন সপ্তাহের মধ্যে তাদের মতামত পুনরায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। অতঃপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগের সঙ্গে পর্যালোচনাক্রমে প্রস্তাবসমূহ বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের মতামত দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে প্রেরণ করবে। সচিব কমিটি দুই সপ্তাহের মধ্যে পর্যবেক্ষণ/মতামত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করবে। আর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক সপ্তাহের মধ্যে সারসংক্ষেপ আকারে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবে।
অষ্টম পে-স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি। তারা সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকুরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ক্যাডার নন-ক্যাডার বৈষম্যের সিদ্ধান্ত বাতিল, ইউএনওকে কর্তৃত্ব প্রদানমূলক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অফিস স্মারক বাতিল, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন এবং সকল ক্যাডার ও সার্ভিসে পদোন্নতির সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন, নিজস্ব ক্যাডার ও ফাংশনাল সার্ভিসবহির্ভূত সকল ধরনের প্রেষণ বাতিল এবং কৃত্য পেশাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার জোর দাবি করে আসছে।


