রাজধানীর ইসলামপুরের ঝব্বু খানম জামে মসজিদের নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেনকে (৪৯) হত্যা করেছে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা। মসজিদের নিচতলায় দুটি ফ্লোরে ৩৩টি দোকান আছে। ওই দোকান থেকে প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকার ভাড়া এবং মসজিদের দানবাক্স থেকে ১০/১২ হাজার টাকা আসে। এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে মসজিদের আয় হতো। মসজিদের কোনো কমিটি না থাকায় দীর্ঘদিন এই অর্থের নিয়ন্ত্রণ মুয়াজ্জিন বেলালই করতেন।
এসব অর্থ আত্মসাৎ ও পুরো মসজিদের নিয়ন্ত্রণ পেতেই খাদেম হাবিবুর রহমান (২০) মুয়াজ্জিনকে হত্যা করেন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন মো. মোশারফ হোসেন (১৯), তোফাজ্জল হোসেন (২৩) ও সারোয়ার হালিম (৩৮)। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও একজন জড়িত রয়েছে। তাকে আটক করা যায়নি।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মফিজউদ্দিন আহমেদ জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন একই মসজিদের খাদেম হাবিবুর রহমান (২০), সহকারী মুয়াজ্জিন হাফেজ মো. মোশারফ হোসেন (১৯), তাঁদের সহযোগী তফাজ্জেল হোসেন (২৩) ও মুয়াজ্জিন বেলালের ব্যবসায়িক অংশীদার সারোয়ার হালিম। তাদের মধ্যে হাবিবকে নড়াইল জেলার নড়াগাতি থেকে, মোশারফকে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের পাইকপাড়া থেকে, তফাজ্জেলকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা থেকে ও সারোয়ার হালিমকে ঢাকার ইসলামপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিসি মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইসলামপুর রোডের ঝব্বু খানম মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে চাকরি করছিলেন বেলাল হোসেন। মসজিদটির দুই ফ্লোরে ৩৩টি দোকানের ভাড়া হিসেবে প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা আয় হয়। মসজিদের দানবাক্স থেকে আরও কয়েক হাজার টাকা আয় হতো। এসব অর্থ থেকে মসজিদের কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের পর একটি অংশ বেলাল নিজের ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতেন। সেখান থেকে বাইরের লোকদের কাছে লাভে টাকা খাটাতেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে ভালো আয় করতেন বেলাল। এসব বিষয় নিয়ে হাবিব ও মোশারফের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়। এর আগেও দুবার বেলালকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তাঁরা।
হত্যার নেপথ্যের কারণ হিসেবে ডিসি বলেন, সারোয়ারের কাছে প্রায় আট লাখ টাকা লাভে খাটানোর জন্য রেখেছিলেন বেলাল। বেলালকে হত্যা করা হলে এই টাকা আর ফেরত দিতে হবে না, তাই হাবিব ও তফাজ্জেলকে ইন্ধন দেন সারোয়ার। বেলাল খুন হলে প্রধান মুয়াজ্জিন হবেন হাবিব। এ ছাড়া মসজিদের আর্থিক বিষয় পরিচালনার দায়িত্বও দেওয়া হবে তাকে। এরই অংশ হিসেবে অজ্ঞাতপরিচয় আরও এক আসামির সঙ্গে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মসজিদে বসে বেলালকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা।
ডিসি মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১ এপ্রিল ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি নড়াইলে চলে যান হাবিব। এর দুই মাস আগে চকবাজার থেকে একটি ধারালো ছুরি ও মুখোশ কেনেন তিনি। পরে ৩ এপ্রিল আবারও কেরানীগঞ্জে ফিরে আসেন হাবিব। সেখান থেকে মোশারফের সঙ্গে কথা বলে ওই দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঝব্বু খানম মসজিদে যান হাবিব। সেখানে মোশারফের কক্ষে অবস্থান করেন তিনি। রাত পৌনে ১১টার দিকে বাইরে থেকে ফিরে দোতলায় ওজুর কার্পেট ঠিক করে তৃতীয় তলায় শোয়ার ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন বেলাল। দোতলা ও তৃতীয় তলার সিঁড়ির মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন হাবিব। বেলাল কাছাকাছি এলে তাঁর পেট ও শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন হাবিব।
ডিসি মফিজউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, মৃত্যু নিশ্চিত হলে বেলালের জামার পকেট থেকে ছয় হাজার টাকা, তার কক্ষের চাবি ও মুঠোফোন নিয়ে মোশারফের কক্ষে চলে যান হাবিব। বেলালকে হত্যার কথা জানিয়ে মোশারফকে দুই হাজার টাকা দিয়ে কেরানীগঞ্জে চলে যান তিনি। যাওয়ার সময় ইসলামপুর ব্রিজের পাশে ড্রেনে ছুরিটি ফেলে যান হাবিব। কেরানীগঞ্জে এক দিন অবস্থান করে ৪ এপ্রিল সকালে নড়াইলে ফিরে যান তিনি।


