বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

নৌ ধর্মঘট দ্বিতীয় দিনে: ভোগান্তি

মজুরি বাড়ানোসহ ১৫ দফা দাবিতে চলমান নৌ শ্রমিকদের ধর্মঘটের মধ্যে মালিকদের উদ্যোগে ঢাকার সদরঘাট থেকে সীমিত পরিসরে লঞ্চ ছাড়লেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। প্রয়োজনের তুলনায় কম সংখ্যক লঞ্চ ছাড়ায় এই ভোগান্তি বলে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।

শুক্রবার সকালে সদরঘাটে লঞ্চের অপেক্ষায় যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অনেক নারী ও শিশুকেও তাদের মধ্যে দেখা যায়।

সকালে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বরিশালের উদ্দেশ্যে গ্রিনলাইন লঞ্চটি ছেড়ে গেলেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া যাত্রীদের।

বিআইডাব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক হুমায়ন আহমেদ জানান, সকালে গ্রিনলাইন সময় মতো ছেড়েও গেলে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে শুধু এমভি ফারহান-১ নামের একটি লঞ্চ ছেড়ে গেছে।

স্বাভাবিক সময়ে বরিশাল থেকে যাত্রী নিয়ে সকালে যেসব লঞ্চ সদরঘাটে আসে সেগুলো পরবর্তী যাত্রা করে বিকালের পর থেকে। তবে সকালে সদরঘাট থেকে চাঁদপুর ও তার আশপাশের লঞ্চগুলো ছেড়ে যায়।

নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সকালের পালায় চাঁদপুরের কোনো লঞ্চই যাত্রী নিতে সদরঘাটে না ভেড়ায় বরিশাল রুটের এমভি ফারহান-১ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এই একটি মাত্র লঞ্চে যাত্রীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককেই অপেক্ষায় থাকতে হয়।

এছাড়া লঞ্চটিতে চাঁদপুরগামী লঞ্চের মতো কেবিন না থাকায়ও অনেককে পিছিয়ে যেতে হয়। তাদের একজন শরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ইচলিতে যাওয়ার জন্য স্ত্রী রাবেয়াকে সঙ্গে নিয়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সদরঘাটে আসেন শরিফুল।

“ঘাটে এসে লঞ্চ না দেখে হতাশ হয়ে পড়ি। পরে মাইকে এমভি ফারহান-১ এর যাওয়ার ঘোষণায় আশাবাদী হলেও কেবিন না পাওয়ায় আর যাওয়া হয়নি। ঘাটেই অপেক্ষা করতে থাকি।”

পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চে ওঠেন তিনি।

সকালে সদরঘাট থেকে পাঁচ থেকে ছয়টি লঞ্চ চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে ছাড়ার কথা থাকলেও সূচি অনুযায়ী শুধু এই লঞ্চটি ছেড়ে যায় বলে ঘাট কর্মকর্তারা জানান।

মজুরি বাড়ানোসহ ১৫ দফা দাবিতে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে বুধবার রাত ১২টা থেকে সারা দেশে নৌযান ধর্মঘট চলছে। ধর্মঘটের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার যাত্রীদের ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে লঞ্চ চালানোর ঘোষণা দেয় মালিকপক্ষ।

তবে ওই দিন সদরঘাট থেকে ছেড়ে গেছে ১৯টি লঞ্চ, যেখানে অন্যান্য দিন দেশের দক্ষিণ জনপদের বিভিন্ন গন্তব্যে ৫০টির বেশি লঞ্চ ছেড়ে যায় বলে বিআইডাব্লিউটিএর পরিদর্শক হুমায়ন জানান।

এদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রী নিয়ে সকালে সদরঘাটে এসেছে ১১টি লঞ্চ, যেখানে অন্যান্য সময় অর্ধশতাধিক লঞ্চ ঢাকা আসে।

মালিকপক্ষ ঘোষণা দেওয়ার পরও সকালে সদরঘাটে লঞ্চ কম থাকার কারণ জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক মালিক বলেন, “শিডিউল অনুযায়ী চাঁদপুরগামী লঞ্চগুলো যাত্রী পরিবহনে না আসায় এটা হয়েছে।”

তবে দিনের পরের ভাগে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Steamer-বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আবুল কাশেম মাস্টার জানান, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, নৌপথে চুরি-ডাকাতি বন্ধ ও নদী খননসহ ১৫ দফা দাবি আদায়ের জন্য এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশের প্রায় ১২ হাজার নৌযানের (কার্গো, কোস্টার, বার্জ) শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি ও ধর্মঘট শুরু করেছেন।

তিনি আরো জানান, মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে এলেও তা বাস্তবায়ন করছে না। সর্বশেষ গত এক মাসের মধ্যে সব দাবি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা কার্যকর করেনি নৌযান মালিকপক্ষ। তাই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এ কর্মসূচি দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক নবী আলম বলেছেন, ‘মন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে কোনো সুরাহা না হওয়ায় ১৫ দফা দাবিতে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের আহ্বানে লাইটারেজ ও ফিশিং জাহাজে ধর্মঘট শুরু হয়েছে।’

বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে নৌযান শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মূল মজুরি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ, মৎস্য শিকারী জাহাজ শ্রমিকদের সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন, নৌপথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ডাকাতি বন্ধ, নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, মেরিন আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, পাইপ লাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের সিদ্ধান্ত বাতিলসহ ১৫ দফা দাবিতে নৌযান শ্রমিকরা বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন।

গত ২৬ জানুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় সভায় দাবিগুলোর ব্যাপারে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিক নেতারা ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে আবারো ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রী এম শাহাজান খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। লাইটারেজ জাহাজ মালিকরা ওই বৈঠকে নতুন করে ১৫ দিন সময় দেয়ার অনুরোধ করেন শ্রমিক নেতাদের। কিন্তু তারা সময় দিতে অপারগতা প্রকাশ করে ধর্মঘট শুরুর ঘোষণা দেন।

আরও পড়ুন