আজ ২৪ এপ্রিল, বিশ্বের ইতিহাসের ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত সাভারে রানা প্লাজা ধসের তৃতীয় বার্ষিকী। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারে বাজার বাসস্ট্যান্ডে ধসে পড়ে ৮তলা বিশিষ্ট রানা প্লাজা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবন দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে। ধূলায় অন্ধকার হয়ে যায় আকাশ। চারদিকে ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। শুরু হয় লাশের মিছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান তৈরি পোশাকশ্রমিকসহ ১ হাজার ১৩৬ জন। আর আহত হয় আরও অন্তত ২ হাজার ৪৩৮ জন।
ভবন ধসের ৩ বছর পার হলেও এখনো অনেক নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও আহত শ্রমিকরা পায়নি প্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতিপূরণ। ফলে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিতে না পারায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি অনেক আহত শ্রমিক।
এমনই হতভাগা শ্রমিকের নাম নিলুফার বেগম। ধসে পড়া রানা প্লাজার ৫ম তলায় থাকা প্যান্টম এ্যাপারেলস কারখানায় কাজ করতেন তিনি। ভবনটি ধসে পড়ার পর ইট-বালু আর কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ার সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয়। কোন রকমে জীবন ফিরে পেলেও হারাতে হয়েছে একটি পা। ধ্বংসস্তূপের নিচে আঘাত পেয়ে মাথা, কিডনিসহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যায় ভূগলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার আশা ছাড়েননি নিলুফা।
নিলুফার বেগম বলেন, ‘ভবন ধসের পর অনেকেই অনেক জায়গা থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। আমিও সেই সময়ে নাম মাত্র কয়েকটি টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলাম। তবে সেই টাকা প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিতে নিতেই শেষ হয়ে গেছে।
তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘বাড়তি কোনো ক্ষতিপূরণ চাই না। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে যে টাকার প্রয়োজন যদি সেই টাকাটা পেতাম, তাহলে হয়তো চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে অন্য কোনো কাজকর্ম করে চলতে পারতাম।’
আরেক আহত শ্রমিক হালিমা বেগম। রানা প্লাজার আটতলায় থাকা নিউ ওয়েব স্টাইল লিমিটেডে কারখানায় অপারেটর পদে কাজ করতেন। ভবন ধসের ঘটনায় নাকের হাড়, ডান-পা ও মাথাসহ শরীরের নানা স্থানে আঘাত পান। ভবন ধসের পর তিনি যে পরিমাণ টাকা অনুদান পেয়েছেন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা টিকিৎসার জন্য ব্যয় করেছেন তিনি। তাই তিনি আর কারো কোনো আশ্বাস শুনতে চান না। তার প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ টুকু পেলেই তিনি খুশি।
রানা প্লাজা ধসের তিন বছর পার হয়েও এখনো ভবন মালিক, গার্মেন্টস মালিকসহ ভবন ধসের সাথে জড়িতদের বিচার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘দেশে অনেক সময়ই অনেক অপরাধের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করা করা হয়। যেমন— সিলেটের শিশু রাজন হত্যা মালার বিচারকাজ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা হলো। অথচ রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৪ জন শ্রমিক নিহত ও ২ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিক আহতের ঘটনায় জড়িতদের বিচার কাজ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে না হওয়াটা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন এই শ্রমিক নেতা।
ভবন ধসের ৩ বছরে এসে হতভাগা শ্রমিকদের এখন একটাই প্রাণের দাবি, আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ সরকার বা বিজেএমইয়ের পক্ষ থেকে যেন তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সঙ্গে ভবন ধসের ঘটনায় প্রধান আসামি ভবন মালিকসহ সকল দোষীদের অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানান তারা।


