কলাবাগানে জোড়া খুনের ঘটনায় সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে সংসদের বাহিরে থাকা বিরোধী দল বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘সন্ত্রাসনির্ভর’ এই সরকার এখন সন্ত্রাসের অন্ধ গলিতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। ওই হত্যাকাণ্ডে বিএনপিকে জড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নেওয়ার কৌশল বলে সমালোচনা করেন রিজভী।
মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, “আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী চটজলদি কী করে বললেন যে, হত্যাকাণ্ডের সাথে বিরোধী দল জড়িত। এর আগেও বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পরপরই বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে বিএনপির লোকদের জড়িত করার।
“এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশে তাদের নিজেদের সীমাহীন ব্যর্থতা ঢাকতেই জনদৃষ্টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য তারা মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সন্ত্রাসনির্ভর এই সরকার সন্ত্রাসবাদের অন্ধ গলিতে পথ হারিয়ে ফেলার কারণে উন্মাদের মতো কথা বলছে।”
সোমবার বিকালে কলাবাগানে নিজের বাসায় খুন হন ইউএআইডির কর্মকর্তা সমকামী অধিকার কর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়। এর দুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা।
এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সোমবার রাতে গণভবনে দলীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে বিএনপি-জামায়াত চক্র বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে।”
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে তার প্রেসসচিব ইহসানুল করিম জানান, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই গুপ্তহত্যা কারা ঘটাচ্ছে সকলেই বোঝেন। নানারূপে বিএনপি-জামাত এগুলো করছে। গত নির্বাচনের সময় থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এখন ব্যর্থ হয়ে গুপ্তহত্যা করছে।”
তবে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য উল্টো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বিএনপি নেতা রিজভী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে দমনে রক্তাক্ত পন্থা অবলম্বন করে নিজের মসনদকে কণ্টকমুক্ত রাখতে যাওয়াতেই দেশব্যাপী হত্যা আর লাশের উৎসব চলছে। ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা উস্কানি পেয়ে ভয়াবহ বেপরোয়া হয়ে উঠার কারণে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
“আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দলীয় ক্যাডার দিয়ে সাজানোর কারণে সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ রক্তঝরা রক্তিম রঙে ঢেকে গেছে। হত্যাকে উসাহিত করার আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি, বিএনপি নয়।”
প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেছে জামায়াতে ইসলামীও।
এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, “কলাবাগানের জোড়া খুনসহ দেশে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ডের সাথেই জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রধানমন্ত্রী জামায়াতের বিরুদ্ধে নির্জলা অসত্য অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
“বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তাই দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য জামায়াতের পরিকল্পিতভাবে গুপ্তহত্যা চালানোর প্রশ্নই আসে না। গুপ্তহত্যা চালানো কিংবা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করার সাথে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই।”
প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে রিজভী বলেন, “যে নেত্রী একটির বদলে দশটি লাশ ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার ক্যাডাররা সেটি করতে পারছে না বলে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন শাড়ি পরতে।
“সুতরাং সেই প্রধানমন্ত্রী যখন দায় চাপাতে চান, তখন জনগণ মনে করে আজকে যে অরাজকতা ও নৈরাজ্যের যে ঘন অন্ধকার, মৃত্যুর মিছিল, লাশের সারি- এটা হচ্ছে একজন বেআইনি ভোটারবিহীন সরকার থাকলেই তাদের দ্বারা সম্ভব।”
বর্তমান সরকার কারও কোনো বক্তব্যের তোয়াক্কা করে না বলে অভিযোগ করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রিজভী।
তিনি বলেন, “এই সরকারের কর্ম-অপকর্মের জন্য যে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, সেটা তাদের প্রয়োজন হয় না। কে কী বলল, আমার কিছু যায় আসে না। আমার এবং আমার ছেলের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে তার কোনো ক্ষমা নেই।
“ক্ষমা নেই বলেই দেশে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি চলছে এটিকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত না করে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে তিনি প্রথমেই বলে বসলেন যে, এটা বিএনপি করছে। এতেই বোঝা যায়, তার ঘটনাটি হচ্ছে- ঘটনা ঘটবে আর আমি বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেবে।”
সরকার এখন পর্যন্ত কোনো হত্যাকাণ্ডেরই সুরাহা করতে পারেনি দাবি করে তিনি বলেন, “মদগর্বী আস্ফালন, হুমকি আর নিজেদের অপকীর্তি অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব করে সরকারের কোনো লাভ হবে না। তাদের পা এখন চোরাবালির উপরে ক্রমাগতভাবে অতলে তলিয়ে যাচ্ছে।”
নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আবদুল মান্নান, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, শাহিন শওকত, আবদুল আউয়াল খান, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


