সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন দেশ অনেক নিরাপদ। আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যা্লয়ের শিক্ষক আর তনয়ের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বুকে হাত দিয়ে বলেন, এদেশ নিরাপদ।
“তনয়ের অন্য কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না। সে দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবাসতো বলেই সাংস্কৃতিক কর্মের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। সারাদেশে কিছুদিন যাবত হন্তারকের হাতে একের পর এক যুবকদের মৃত্যু হচ্ছে। তাহলে এই কথাই বলতে হয় আমরা নিরাপদ নই। এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।”
মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সামনে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বি তনয়কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে তিনি একথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন,‘আপনার এই হন্তারকদের গ্রেফতার করুন। শাস্তি দিন এর বেশি কিছু চাই না’।
সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষকে এ ব্যাপারে এক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ে শামিল হই। আমাদের জন্য এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ লড়াইয়ে হারা যাবে না। হারলে বাংলাদেশ হেরে যাবে।
নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, ৪৪ বছর আগে পাকিস্থানীরা যেভাবে পরিকল্পিতভাবে দেশের বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছিল সেই একই ভাবে একের পর এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করে বলছি, দেশ স্বাধীন করেছি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির জন্য। আপনাদের এ নিশ্চয়তা দিতে হবে, না হলে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সবই মিথ্যা হয়ে যাবে।’
রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘মৃত্যুর মিছিল কেবলই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আমরা শোকে কাতর হই। কয়েকদিন পর আবার ভুলে যাই। কিন্তু কোন বিচার পাই না।’
এভাবে কতজনকে আর প্রান দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আসুন সকলেই মিলে একজোট হয়ে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলি।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস আইন শৃংখলা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের কাছে আকুল আবেদন এ ধরনের হত্যা বন্ধ করুন। আমরা আপনাদের সাথে আছি।’ তিনি বলেন, ‘এ মৃত্যু যেন সবার চোখ খুলে দেয়। এ মৃত্যুই যেন শেষ মৃত্যু হয়।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারন সম্পাদক হাসান আরিফ বলেন, ‘আমরা আর মৃতদেহের উপর ফুল দিতে চাই না। সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সংগ্রামী হোন। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই কেবল তনয়রা বাঁচবে।’
ফকির আলমগীর বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তনু এবং তনয় সকল হত্যাকাণ্ডই একই সূত্রে গাঁথা। সবাই এক হতে পারলে দেশ বাঁচবে, দেশের তরুনরা বাঁচবে।’
নিহত তনয়ের মামা বলেন, ‘তনু আমাদের আদরের ছিল। মাত্র ২৯ বছর বয়সে তাকে এভাবে হারাতে হবে আমরা ভাবতে পারিনি’।
বক্তারা বলেন, সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। তারা ব্যর্থ হয় না। এত কিছুর পরও পুলিশ কিছুই বের করতে পারে না। বরং পুলিশকেই আহত হতে হয়। জানিনা এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারবে কিনা? অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারবে কিনা?
এ সময় নিহত তনয়ের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা থিয়েটার, দৃষ্টিপাত নাট্যসংসদ, মহাকাল নাট্য সংসদ, বাংলাদেশ থিয়েটার, বটতলা, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, শিল্পকলা একাডেমির কর্মচারি ইউনিয়ন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমির চলচ্চিত্র ও নাট্যকলা বিভাগ, লোকনাট্যদল (বনানী), বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ , বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন সহ বিভিন্ন নাট্য সংগঠন।
এরপর জাতীয় নাট্যশালার সামনেই নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বি তনয়ের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় নাট্যকর্মীদের মধ্যে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারনা করেন। সহকর্মীকে বিদায় দিতে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার নিজের সংগঠন লোকনাট্যদল ও অন্যান্য নাট্যসংগঠনের কর্মীরা।
মাহবুব রাব্বি তনয়ের হত্যার প্রতিবাদে আগামীকাল বিকেল ৫টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান।


