বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বিশিষ্টজনদের নিরাপত্তায় পুলিশ নিয়োগের চিন্তায় সরকার

bishishtojonদেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে ইতমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছে সরকার। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কর্মসূচি কর্মকর্তা ও সমকামীদের অধিকার বিষয়ক সাময়িকী ‘রূপবান’ এর সম্পাদক জুলহাজকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যার পর সামগ্রিক পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে বিশিষ্টজনদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে সরকার এমনটাই জানিয়েছে বিশেষ কয়েকটি সূত্র।

হত্যার হুমকি পাওয়া জনপ্রিয় লেখক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাফর ইকবালকে সশস্ত্র পুলিশি নিরাপত্তা দেয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যায়ক্রমে হুমকি পাওয়া সকল বিশিষ্টজনদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শনিবার সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে অধ্যাপক জাফর ইকবালের নিরাপত্তার তথ্যটি জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ। জানান, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন থেকে জাফর ইকবালকে সশস্ত্র পুলিশি নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।

তিনি আরো জানান, দিনের বেলায় ড. জাফর ইকবালের সঙ্গে দুজন এবং রাতে তিনজন সশস্ত্র পুলিশ থাকবে।

এক প্রশ্নের জবাবে রহমত উল্লাহ বলেন, নতুন করে জাফর ইকবালকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়ার তথ্য নেই। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে সিলেটের কোনো ব্যক্তি যদি জীবননাশের হুমকি পেয়ে থাকেন, তবে সেটা পুলিশকে জানিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ।

গত ১০ নভেম্বর মোবাইল এসএমএসে হত্যার হুমকি পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সেখানে বলা হয়, ব্লগারদের পক্ষে দাঁড়ালে তাকে ‘চাপাতির আঘাতে’ মরতে হবে।

হুমকি পাওয়া বিশিষ্টজনের প্রথমে এই পুলিশি নিরাপত্তার আওতায় আনা হতে পারে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বিভিন্ন সংগঠনের নামে বিভিন্ন সময় বিশিষ্টজনদের হত্যার হুমকি দেয়া হয়।

এই তালিকায় যারা আছেন-বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান, ঢাবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার কবির, মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষক অধ্যাপক জাফর ইকবাল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, উপস্থাপিকা নবনীতা চৌধুরী, দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক শ্যামল দত্ত, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের নেতা কামাল পাশা চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক শাহীন রেজা নূর, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধন, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, ব্লগার কানিজ আকলিম সুলতানা, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী এস এম শাহীন, আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আরাফাত রহমান, সাংবাদিক মুন্নী সাহা, বৈশাখী টেলিভিশনের সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল এবং সঙ্গীতা ইমাম।

এদিকে দশ বিশিষ্টজনকে হত্যার হুমকি দিয়ে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’র নামে চিঠি পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি জিডিও হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের সনাক্ত করতে বিশেষায়িত টিম দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, বিষয়টিকে আমরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। কারা এটি করেছে সেটির একটি বিশেষ টিম নিয়োগ করে তদন্ত হওয়া দরকার। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আমাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছি।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শুধু বিশিষ্টজন নয়, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়াই আমাদের দায়িত্ব। আর সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কারা এটি করছে সেটি অনুসন্ধান করে যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়, তাহলে এগুলো কমে যাবে। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, এ ধরণের বিষয় আমাদের দেশের জন্য হুমকি স্বরূপ। যাদের হুমকি দেয়া হয়েছে তাদের হয়তো এখন নিরাপত্তা দেয়া হবে। কিন্তু যেসব মুক্তমনা লেখক ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে, সেসবের বিচার আগে হওয়া উচিৎ।

অন্যদিকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র এসব হুমকি দিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এসব হুমকির সঙ্গে জড়িতদের হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এমনটায় জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা করা হচ্ছে। এছাড়া গত বছরের মে মাসে অধ্যাপক জাফর ইকবালসহ দেশের ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার হুমকি দেয় ‘আনসার উল্লাহ বাংলা টিম- ১৩’। এসব হুমকি পেয়ে অনেকেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিপি) করেছেন।

এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর দুপুরে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একে এম শফিউল ইসলাম। তিনিও প্রগতিশীলতা ও গানের চর্চা করতেন।

তখন জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এ হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে। তবে পুলিশ তা নাকচ করে দেয়।

এছাড়া ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় সকালে হাটতে বের হয়ে খুনের শিকার হন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস।

অপরদিকে ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এস তাহের ।দুই দিন পর ক্যাম্পাসের বাসার পাশের ম্যানহোলের ভেতরে তার লাশ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন