হোটেল তো নয়, যেন বিদেশী মদ-বিয়ারের খনি। বিশাল বিশাল সব কার্টনভর্তি রংবেরঙের আমদানি নিষিদ্ধ মদের গুদাম। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে টানা চারদিনের অভিযান। অবশেষ সফল হয় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর। অভিযানের একপর্যায়ে মঙ্গলবার হোটেলের একটি সুরক্ষিত গোপন কুঠুরি আবিষ্কার করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যেটি ছিল চোরাইপথে আনা বিদেশী মদ-বিয়ারের গুদাম। তবে বিশেষ কায়দায় লুকানো এ গুদামে যে পরিমাণ মদ থাকার ধারণা করেছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বাস্তবে পাওয়া যায় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
এত বিপুল পরিমাণ বিদেশী মদ-বিয়ারের মজুদ দেখে শুল্ক কর্মকর্তাদের চোখ রীতিমতো ছানাবড়া হয়ে যায়। গুনে গুনে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১ হাজার ৩৩৭ বোতল মদ জব্দ করা হয়। যার মূল্য এক কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া হোটেলে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় নেশা হিসেবে ব্যবহৃত ২২ কেজি অ্যারাবিয়ান সিসা। আমদানি নিষিদ্ধ এসব সিসা বিত্তবান তরুণ-তরুণীদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশী মদ-বিয়ার চোরাচালানে জড়িত ছিল। চোরাচালানের মাধ্যমে এ হোটেলে এখন পর্যন্ত মোট ২২ টন বিদেশী মদ-বিয়ার আনার তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে এসব মদ-বিয়ারের ব্যবসা করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছিল রিজেন্সি হোটেল। এর আগে শুক্রবার ২শ’ বোতল বিদেশী মদ ও বিপুল পরিমাণ বিয়ার জব্দ করা হয়। এরপর থেকেই হোটেলটিতে টানা অভিযান চলছিল। এরই একপর্যায়ে দ্বিতীয় দফায় এক কোটি টাকার মদ-বিয়ার জব্দের পর হোটেলটির মদ চোরাচালান তদন্তে নতুন মাত্রা যুক্ত হল।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল কর্তৃপক্ষ অন্তত ২৭ টন বিদেশী মদ-বিয়ার বিক্রি করেছে। হোটেলের নথিপত্রেই এর প্রমাণ মিলেছে। অথচ তারা মাত্র ৬ টন মদ-বিয়ার আমদানির তথ্য দিতে পেরেছে। বাকি ২২ টন মদ-বিয়ার অবৈধভাবে চোরাচালানের মাধ্যমে আনা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈধপথে তারা ২ হাজার ২৩৮ লিটার মদ ও ৪ হাজার ৪৪৬ লিটার বিয়ার আমদানি করে। বাকি ২২ টন মদ-বিয়ার চোরাইপথে নিয়ে আসে রিজেন্সি হোটেল কর্তৃপক্ষ।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে মদ আমদানির ক্ষেত্রে ৬০১.৯৯ শতাংশ ও বিয়ারের ক্ষেত্রে ৪৪৭.১০ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সে হিসাবে হোটেল রিজেন্সি কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। ফাঁকি দেয়া রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য হোটেল থেকে এ সংক্রান্ত নথিপত্র জব্দ করা হয়। এসব নথি পর্যালোচনার কাজ চলছে।
শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, ২৭ এপ্রিল একটি সন্দেহভাজন গাড়ি জব্দের অভিযানে নেমে এসব মদ-বিয়ারের সন্ধান পাওয়া যায়। এদিকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা বিদেশী গাড়ি ও মদ-বিয়ার কেলেংকারি ধরা পড়ার পর বিদেশে পালিয়ে যান হোটেলের পরিচালক আরিফ মোতাহার। হোটেলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কবির রেজা এখন নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। কবির রেজা যাতে কোনোভাবেই পালাতে না পারেন সে ব্যাপারে ইমিগ্রেশন পুলিশকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাকে যে কোনো সময় গ্রেফতার করা হতে পারে। এছাড়া হোটেলের নির্বাহী পরিচালক শহীদ হামিদসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকেও নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করা হচ্ছে।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, হোটেলের নামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে ইস্যু করা মদের বার লাইসেন্স রয়েছে। সে অনুযায়ী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের পক্ষ থেকে মজুদ ও বিক্রয় তালিকা নিয়মিত পরিদর্শন করা কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে হোটেলটিতে এত বিপুল পরিমাণ মদ-বিয়ার মজদু করা সম্ভব হতো না।
এদিকে বিপুল পরিমাণ বিদেশী মদ-বিয়ার চোরাচালানের অভিযোগের বিষয়ে হোটেলের চেয়ারম্যান কবির রেজা বলেন, তারা অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। জব্দকৃত মদ-বিয়ার আমদানির সব কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। এসব কাগজপত্র শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাদের হোটেলে বেআইনি কোনো কর্মকাণ্ড হয় না।


