বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

রায়ের কপি কারাগারে, ফাঁসির দ্বারে নিজামী

Nizami--ray-copyবিচারকদের সইয়ের পর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজের রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কারাগারে পৌঁছানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসির আসামি নিজামীকে এই রায় পড়ে শুনাবেন। তার জানতে চাওয়া হবে- তিনি কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। আদালতের সব বিচারিক প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ায় একাত্তরের বদরপ্রধান নিজামীর সামনে এখন কেবল ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগটাই বাকি।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রিভিউ খারিজের রায়ে বিচারকদের স্বাক্ষরের পর সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তা প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। ২২ পৃষ্ঠার ওই রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটেও প্রকাশ করা হয়।

আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুনাভ চক্রবর্তী এরপর তা পৌঁছে দেন এ মামলার বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

অরুনাভ চক্রবর্তী বলেন, রায়ের তিনটি অনুলিপি দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেগুলো ট্রাইব্যুনাল, কারা কর্তৃপক্ষ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুই পক্ষের আইনজীবীকেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

পরে পৌনে ৭টার দিকে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার শহীদুল আলম ঝিনুক বলেন, “রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এতে সই হওয়ার পর ওই আদেশ ও রায়ের কপি কারা কতৃপক্ষ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।”

সন্ধ্যা ৭টায় ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার কেশব রায় চৌধুরীকে পূর্ণাঙ্গ রায় নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে দেখা যায়।

গত ৫ মে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ নিজামীর আবেদন খারিজ করে দেয়।

কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিজামী
যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মতিউর রহমান নিজামীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়েছে। রিভিউ আবেদন খারিজের তিন দিন পর রোববার মধ্যরাতে নিজামীকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে আনা হয়।

আইনি শেষ লড়াইয়ে হারের পর একাত্তরের এই আল বদর নেতার সামনে এখন কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগই রয়েছে। তিনি ক্ষমা না চাইলে কিংবা চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হলে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেবে সরকার।

জামায়াতে ইসলামীর আমির নিজামী অনেক দিন ধরেই কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন। রিভিউ আবেদন খারিজের পরদিন গত শুক্রবার সেখানে তার সঙ্গে দেখা করেন স্ত্রী-সন্তানরা।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে নিজামীকে নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে একটি প্রিজন ভ্যান ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে বলে কারা কর্মকর্তারা জানান। এটি ঢাকা কারাগারে পৌঁছায় রাত ১২টার ঠিক আগে।

যুদ্ধাপরাধে এর আগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অন্যদের দণ্ডও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর হয়েছিল।

বাকি প্রাণভিক্ষা
দণ্ড কার্যকরের আগে যুদ্ধাপরাধী নিজামীর শেষ আইনি সুযোগ ছিল রিভিউ আবেদন। তা খারিজের মধ্য দিয়ে আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি হয়েছে। এখন সংবিধানের ৪৯ অনু্চ্ছেদ অনুসারে শেষ সুযোগে দণ্ডাদেশ পাওয়া আসামি প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন।

আসামি তা না চাইলে বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা না পেলে সরকার দিনক্ষণ ঠিক করে কারা কর্তৃপক্ষকে ফাঁসি কার্যকরের নির্দেশ দেবে। তার আগে স্বজনেরা কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পারবেন।

রিভিউ খারিজের পর এরইমধ্যে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েরা কাশিমপুরে গিয়ে নিজামীর সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেছেন। তবে সে সময় তারা ক্ষমা ভিক্ষার  বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  এর আগে জানিয়েছেন, রিভিউয়ের রায় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে যাবে। দিন তারিখ ঠিক করবে সরকার এবং দণ্ড কার্যকর করবে কারা কর্তৃপক্ষ।

“তবে এর আগে নিজামী যদি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা করতে চান সে সুযোগ তিনি পাবেন। তাকে সেটি জানানো হবে।”

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে।

আর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ।

তাদের দুজনের রিভিউ আবেদন একদিনের মধ্যে শুনানি শেষে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চাননি বলে সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়, পরে তাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

এরপর জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় একই দিনে, গতবছর ২১ নভেম্বর। তারা প্রাণভিক্ষার আবেদন করলেও রাষ্ট্রপতি তা নাকচ করে দেন বলে সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

এর বাইরে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিদের মধ্যে কেবল জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় এসেছে আপিল বিভাগে। ট্রাইব্যুনালে তাকে দেওয়া সর্বোচ্চ সাজার রায় কমিয়ে আপিল বিভাগ আমৃত্যু কারাদণ্ডের যে রায় দিয়েছে, তার রিভিউ চেয়েছে দুই পক্ষই।

বিচারের কালক্রম
# ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করার পর একই বছরের ২ অগাস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

# ২০১২ সালের ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

# তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৬ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। নিজামীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন।

# বিচার শেষে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল যে রায় দেয় তাতে প্রসিকিউশনের আনা ১৬ অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই আট অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর ঘটনায় নিজামীর ফাঁসির রায় হয়।

# ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন নিজামী। নিজামীর করা আপিলে ১৬৮টি যুক্তি তুলে ধরে সাজার আদেশ বাতিল করে খালাস চাওয়া হয়। সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

# এই আপিলের ওপর ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শুনানি শুরু হয় চলে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দ্বাদশ দিনে শুনানি নিয়ে ৮ ডিসেম্বর আদালত রায়ের দিন ঠিক করে দেয়।

# ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগেও ফাঁসির রায় বহাল থাকে।

# ১৫ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করলে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। পরদিন তা নিজামীকে পড়ে শোনানো হয়।

# ২৯ মার্চ নিজামী রিভিউ আবেদন করলে ৩ মে শুনানি হয়। বৃহস্পতিবার রিভিউ খারিজ করে আপিল বিভাগ।

জামায়াত আমির নিজামী একাত্তরে ছিলেন দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নাজিমে আলা বা সভাপতি এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত আল বদর বাহিনীর প্রধান।

তার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নেতৃত্বেই যে আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল- এই মামলার বিচারে তা প্রমাণিত হয়।

সুপ্রিম কোর্ট ১৫ মার্চ আপিলের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করলে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে, পর দিন তা পড়ে শোনানো হয় যুদ্ধাপরাধী নিজামীকে।

আরও পড়ুন