মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর রায় কার্যকর হয় মঙ্গলবার মধ্যরাতে। শেষ সময় তিনি কীভাবে কাটান, তা নিয়ে কৌতূহল অনেকেরই। বিষয়টি জানতে কথা হয় কারাগারে নিজামীর সেলের দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নামাজ আর কোরআন তেলাওয়াত করে সময় পার করেছেন নিজামী। তিনি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
কারাগার সূত্রে জানা যায়, সোমবার রায় পড়ে শোনানোর পর থেকে নিজামী কিছুটা উদ্বিগ্ন হন। রাতে অনেক দেরি করে ঘুমাতে যান। তিনি নফল নামাজ আর কোরআন তেলাওয়াত করেন অনেক রাত পর্যন্ত। পরে ঘুমিয়ে পড়েন।
মঙ্গলবার খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন নিজামী। নামাজ আদায় করেন, কোরআন তেলাওয়াত করেন। কিছুটা সময় অন্য বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে পার করেন। পরে অন্য বন্দিদের সঙ্গে তাঁকেও সকালের নাশতা দেওয়া হয়।
নাশতায় ছিল দুটি রুটি ও এক বাটি ভাজি। ডিম বা চা লাগবে কি না, এমন প্রশ্ন করলে তিনি ‘না’ বলেন। তা ছাড়া তাঁর চায়ের অভ্যাস নেই বলেও জানান।
এরপর নিজামী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা যায় কি না, তা জানতে চান একজন ডেপুটি জেলারের কাছে। জেল সুপার জানান, রায় পড়ে শোনানোর সময় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রাণভিক্ষার বিষয়টি হাকিমের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসা করা হয়।
সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির সাংবাদিকদের বলেন, একজন আসামি জেলে থাকাকালীন যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তার সব কিছুই নিজামীকে দেওয়া হয়।
রাত ৮টায় স্বজনদের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করেন মতিউর রহমান নিজামী। ঘণ্টাখানেক তারা নিজামীর সঙ্গে কথা বলেন।
কারাগার সূত্রে জানা য়ায়, রাত ১০টার দিকে নিজামী রুমে গিয়ে গোসল সেরে নেন। গোসল শেষে তিনি নফল নামাজ আদায় করেন। এর পর তাঁকে খাবার দেওয়া হয়। খাবারে ছিল মাছ, মাংস, সবজি ও ডাল। কিন্তু তিনি কোনো খাবার খাননি। রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাঁর কক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগারের মসজিদের ইমাম মনির হোসেন প্রবেশ করেন। তিনি নিজামীকে গোসল করার জন্য বলেন। নিজামী জানান, তিনি গোসল করেছেন। ইমাম তওবা পড়াতে চাইলে নিজামী নিজে নিজে তওবা পড়েন। কেন্দ্রীয় কারা মসজিদের ইমাম হাফেজ মনির হোসেন মতিউর রহমান নিজামীকে তওবা পড়ানোর সময় উপস্থিত ছিলেন।
রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তিন জল্লাদ তাঁর কক্ষে প্রবেশ করেন। তাঁরা তাঁকে প্রস্তুতি নিতে বলেন। এ সময় তিনি কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। খুবই স্বাভাবিক ছিলেন। জল্লাদরা তাঁকে যমটুপি পরিয়ে কক্ষ থেকে বের করেন। হেঁটে হেঁটে মঞ্চে যাওয়ার সময় তিনি স্বাভাবিক ছিলেন। ১১টা ৫৭ মিনিটে তাঁকে মঞ্চে তোলা হয়। এ সময়ও তিনি খুব স্বাভাবিক ছিলেন। মঞ্চে ওঠানোর পর আবার তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখেন সিভিল সার্জন। এর পর ফাঁসির জন্য তাঁকে প্রস্তুত করা হয়। তাঁর ডান পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জল্লাদ রাজু।
সূত্র জানায়, ১২টা ১০ মিনিটে ম্যাজিস্ট্রেট লাল রুমালটি ফেলে দিলেই নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করেন রাজু। নিয়ম অনুযায়ী ফাঁসিকাষ্ঠে তাঁকে ২০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয়। সাড়ে ১২টার সময় ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে নামিয়ে তাঁর লাশের গোসল করানো হয়। এর পর কফিন করা হয়। রাত দেড়টার দিকে কারাগার থেকে তাঁর লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পাবনার সাঁথিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়।
ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন- জেলা প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দিন, সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। এরপর বিকেল ৫টার কিছু পর আপিল বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল রায়ের কপি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে দেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে লাল কাপড়ে মোড়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে রওনা হয়। পরে ৭টা ৫ মিনিটে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবীর রায়ের কপি গ্রহণ করেন।
গত রোববার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মতিউর রহমান নিজামীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়।
গত ৫ মে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
o নিজামীকে ঝুলালো এই সেই জল্লাদ রাজু


