বিশেষ প্রতিনিধি, স্টকহলম থেকে
পশ্চিমা দেশে রাজনৈতিক দলগুলো চলে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায়। এসকল দেশে নাই কোনো বেক্তি কেন্দ্রিক কিংবা পারিবারিক রাজনীতি। নিজস্য যোগ্যতার ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। দল চলে দলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে। আর এই গঠনতন্ত্র জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সংশোধন ও সংযোজন করা হয়। সারা দেশ থেকে দলীয় প্রতিনিধিদের যোগদানের মধ্য দিয়ে গত ৫ মে থেকে ৮ মে অনুষ্ঠিত হয়েছে সুইডেনের ষষ্ঠ রাজনৈতিক দল ভেনসটার পার্টির (লেফট পার্টি) জাতীয় কাউন্সিল। প্রতি দুই বত্সর অন্তর অন্তর এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবারের কাউন্সিল অধিবেশনে স্টকহলম থেকে মোট ৫৭ জন প্রতিনিধি যোগদান করেন। বাংলাদেশী বংশদ্ভুত সুইডিশ রাজনীতিবিদ মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু স্টকহলম প্রতিনিধি হিসেবে কাউন্সিলে অংশ গ্রহণ করেন। সারা দেশ থেকে মোট ২২৫ প্রতিনিধি লেফট পার্টির এই জাতীয় কাউন্সিলে যোগদান করেন । এছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটি, হিসাব পরীক্ষক, ইলেকশন কমিটি, দলের পার্লামেন্ট মেম্বার, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট মেম্বার ও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা অতিথি হিসেবে কংগ্রেসে যোগদান করেন।
সুইডিশ পার্লামেন্টে বর্তমানে সাতটি রাজনৈতিক দল অবস্থান করছে। লেবার পার্টি আসন সংখা ১১৩, রক্ষণশীল দল মডরেট ৮৪, বহিরাগত বিরোধী বৈসম্মবাদী রাজনৈতিক দল সুইডিশ ডেমোক্রেট ৪৮, গ্রিন পার্টি ২৫, সেন্টার পার্টি ২২, লেফট পার্টি ২১, লিবারেল পার্টি ১৯ ও ক্রিস্ট ডেমোক্রেট ১৬ আসন রয়েছে। সুইডিশ পার্লামেন্টের মোট আসন সংখা ৩৪৯।
দলের নিয়ম অনুসারে জাতীয় কাউন্সিলে অংশগ্রহণকৃত প্রতিনিধিরা তাদের স্ব স্ব জেলায় সদস্যদের সরাসরি নির্বাচনে জাতীয় কাউন্সিলের প্রতিনিধি নির্বাচিতহয়ে থাকেন। যারা এই জাতীয় কাউন্সিলে যোগদান করার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের কাউন্সিল অধিবেশন শুরুর অনেক পূর্ব থেকেই ডিস্ট্রিক কমিটিগুলো কয়েকটি সভার মধ্য দিয়ে কাউন্সিল অধিবেশনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করে থাকে। অন্যদিকে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দলের সকল সদস্যদের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে লিখিতভাবে বিভিন্ন প্রস্তাব প্রেরণ করার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রেরিত এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি কিছু কিছু গ্রহণ করে এবং বাকি প্রস্তাবগুলো নাকচ করে দেয়। কিনতু কেন্দ্রীয় কমিটি নাকচ করে দিলেও পরবর্তিতে প্রস্তাবগুলো জাতীয় কাউন্সিলে তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক নাকচ হওয়া প্রস্তাবগুলো প্রতিনিধিদের ভোটে পাশ করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উধারণ সুরূপ দলের কেন্দ্রীয় কমিটি তুরস্কে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলট পি কে কে নামের পূর্বে টেররিস্ট শব্দটি বহাল রাখার প্রস্তাব উত্থাপন করলে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোটের মাধ্যমে টেররিস্ট শব্দটিকে বাতিল করা হয়। তার অর্থ হলো এখন থেকে তুরস্কে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলট পি কে কে সুইডিশ লেফট পার্টি আর টেররিস্ট দল হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারবে না। পি কে কে স্বাধীন কুর্দিস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন থেকে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম করছে। দলীয় প্রধান বর্তমানে তুরস্কের কারাগারে দীর্ঘদিন থেকে বন্দী। দলের সশস্ত্র সংগ্রামের কারণে সুইডেন সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দলটির নামের সাথে টেররিস্ট স্ট্যাম্প লাগিয়ে দেয়। ১৬ বছর বয়স থেকে ভোটাধিকার ও দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় করার প্রস্তাব দুইটি কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক বাতিল করা হলে প্রতিনিধিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভোট হলেও পূর্বের আনীত সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। এভাবেই দলের গঠনতন্ত্র ও রাজনৈতিক আদর্শ ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন ও সংযোজন করার সুযোগ থাকে।
ঠিক একইভাবে বর্তমানে লেফট পার্টির রাজনৈতিক আদর্শ ফেমিনিস্ট সোসালিষ্ট পার্টির সাথে এন্টি রেসিস্টিক কথাটি সংযোজনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি তা নাকচ করে দেয়। পরবর্তিতে প্রতিনিধিদের ভোটেও এন্টি রেসিস্ট শব্দটি সংযোজনের বিরুদ্ধে ভোট পড়লে তা বাতিল হয়ে যায়। ফলে দলের নামের সাথে এখন শুধুমাত্র ফেমিনিস্ট সোসালিষ্ট শব্দটি বেবহার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সুইডেনের ওরেব্রূ শহরে অনুষ্ঠিত লেফট পার্টির এই জাতীয় কাউন্সিলে দলের নির্বাচন বোর্ড ২২ সদস্য বিশিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় কমিটির নাম ঘোষনা করে। যেহেতু লেফট পার্টি একটি ফেমিনিস্ট পার্টি এই কারণে কমিটিতে ১৬ মহিলা ও ৬ পুরুষের নাম ঘোষণা করলে প্রতিনিধিদের সরাসরি ভোট তা পাশ হয়ে যায়। এছাড়া কমিটির অতিরিক্ত সদস্যদের মধ্যে ৮ মহিলা ও ২ পুরুষকে নির্বাচিত করা হয়। তবে দলের সভাপতি পদ আলাদাভাবে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। বর্তমান সভাপতি ইউনাস সুসট্যাড্ এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদন্দী না থাকায় তিনি পুনরায় সভাপতি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হন। একইসাথে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি নির্বাচন কমিটির নাম কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক ঘোষণা করা হলে তা প্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত করা হয়। এই ১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির একজন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশী বংশদ্ভুত সুইডিশ রাজনীতিবিদ মহিবুল ইজদানী খান ডাবলুও জয়লাভ করেন।


