বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিদায় স্বাগতম অনুষ্ঠান আর কত দিন চলবে ?

Dablu-ssমহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহলম থেকে।

বেশ অনেক আগে প্রখ্যাত সাংবাদিক আবেদ খান দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাত্রাকালে বিমানবন্দরে বিদায় ও স্বাগতম জানানোকালে রাস্তায় সৃষ্টি হওয়া যান জোট সমস্যা  নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন। লেখাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে লেখা হয়েছিল। কিন্তু তার সেই অনুরোধের বাস্তব প্রতিফলন এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত নয়। বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর প্রথা শুরু হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। পাক ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্থান সরকার ইংরেজদের রেখে যাওয়া এই নিয়মকে অনুসরণ করেছে। এই সময় আমরা দেখেছি আজম খান, মোনায়েম খান, আয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান সহ পাকিস্থানের ক্ষমতাধর বেক্তিদের বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একসময় গণভবনে কোথায় কোথায় এধরনের প্রচলন রাখা আর না রাখার বেপারে আলোচনা করেছিলেন। বিষয়টিকে তিনি সীমিত করে আনতে চেয়েছিলেন। তবে পরবর্তিতে  সরকারিভাবে কোনো নির্দেশ জারির পূর্বেই ঘটে যায় বেদনাদায়ক পচাত্তরের হত্যাকান্ড।

পঁচাত্তরের পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা জিয়াউর রহমান ও হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এ ব্যাপারে কখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহনের চিন্তা ভাবনা করেননি। এমনকি পরবর্তিতে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আমলেও কখনো বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এভাবেই দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসছে বিমান বন্দরের অভ্যর্থনা / বিদায়ের অনুষ্ঠান। ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লন্ডন সফরকালে একই চিত্র দেখা গেল টেলিভিশনের পর্দায়। এখন প্রশ্ন হলো এধরনের যান জোট সৃষ্টি করে জনগনকে কষ্ট দিয়ে বিরাট গাড়ি বহরসহ বিমানবন্দরে যাওয়া আসার কোনো প্রয়োজন আছে কি? অন্যদিকে বার বার এই স্বাগতম ও বিদায় অনুষ্ঠান করার গুরুত্বতা  ও প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? সরকার প্রধানের বিদেশ সফরকালে এই বিদায়/ স্বাগতম অনুষ্ঠান এভাবে আর কত দিন চলবে ?

শুরুতেই সাংবাদিক আবেদ খানের যে কথা বলেছিলাম, তিনি জনগনের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এধরনের অনুষ্ঠান বাতিল করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে আদৌ নেওয়া হবে কি হবে না তা সরকারের উপর নির্ভর করছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কেনাডা এমনকি ব্রিটেন সহ বিশ্বের অনেক  দেশেই এধরনের অনুষ্ঠান করতে দেখা যায় না। তবে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সফরে এলে কখনো কখনো টেলিভিশনে বিমান বন্দরে অভ্যর্থনার দৃশ্য প্রচারিত হয়। তাও খুব কদাচিত। সাধারণ জনগণ যা জানতে পারে কিংবা দেখতে পারে তা হলো দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক ও তার ফলাফল। শুধু এইটুকুই। পশ্চিমা  দেশের প্রধানমন্ত্রীদের বিদেশ সফরের সময় বিমান বন্দরে অফিসিয়ালি কোনো অনুষ্ঠান করার নিয়ম নেই। প্রধানমন্ত্রী কখন কোথায় যান তা টেলিভিশনেও দেখানো হয় না।  শুধুমাত্র দৈনিক পত্রিকার কোনো কোনো পাতায় ছোটো করে সংবাদ প্রচার করা হয়।  তবে তাও  নির্ভর করে সফরের গুরুত্বতার উপর।

রাজধানী ঢাকার বর্তমানে যে ট্রাফিক অবস্থা সেখানে এধরনের অনুষ্ঠান জনগনের জন্য নিয়ে আসে এক বিরাট দুর্ভোগ। ভি আই পিদের জন্য দীর্ঘ সময় আটকিয়ে রাখা হয় রাস্তা। ভালো মন্দ দেখার সময় এখানে নেই। রাজনীতি যারা করেন তারা তো জনগনের প্রতিনিধি। তাদের প্রধান দায়িত্ব জনগনের সেবা করা। যে বেবস্থা জনগনকে কষ্ট দেয়, হয়রানি করে, দুর্ভোগে ফেলে, তা কখনই একজন রাজনীতিবিদের  কাম্য হতে পারে না। প্রতিদিন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সহ অনেক ভি আই পি লোকের যাতায়াতে ঢাকার রাজপথকে যেভাবে আটকিয়ে রাখা হয় তাতে জনগণকে দেখেছি শুধু ধিক্কার দিতে। কষ্টের জন্য নিরবে প্রতিবাদ জানাতে। সরকারের উপর নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে। ভেবে দেখুন এইসময় এম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া একজন মুমুর্ষ রোগীর কথা। কিন্তু কে শুনে কার কথা। বৃটিশের সৃষ্টি করা এই নিয়ম এখন ব্রিটেন পালন না করলেও কমনোওয়েলথ ভুক্ত অনেক দেশেই রয়ে গেছে এই প্রথা।  জনগণ অতিসত্তর এই প্রথার অবসান চায়। জনগনের এই নিরব প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও কষ্টের কথা সরকার কি কোনো দিনও শুনবে না ?

যারা জনগনের জন্য রাজনীতি করেন বলে নিজেদের অবস্থানকে তুল়ে ধরেন তাদের জনগনের ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব অনেক। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাইলে মুহুর্তের মধ্যে বৃটিশের রেখে যাওয়া এই পুরানো নিয়মকে বাতিল করতে পারেন। শুধুমাত্র বিমান বন্দরে স্বাগতম ও বিদায় অভ্যর্থনাই নয় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ভি আই পিদের ঢাকার রাজপথে প্রটেকশনের নামে রাস্তায় আর যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি  করা না হয়। জনগনের ভালবাসা ও সমর্থন পেতে হলে সরকারকে বিষয়টি নিয়ে একবার ভেবে দেখা উচিত বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। প্রতিদিন জনগনকে দুর্ভোগে ফেলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে এধরনের কাজ আদৌ  যুক্তিসঙ্গত কি না তা সরকারকে ভেবে দেখা উচিত। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদ জনগনের এই কষ্ট ও ক্ষোভ সেদিনই বুঝতে পারবেন যেদিন  তারা নিজেরা  রাস্তায়  কোনো  প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি  না  করে নিজ নিজ  অফিসে  যাবেন। ঢাকার  ট্রাফিক  বেবস্থার  অনিয়মের  কারণ  তখন তারা বাস্তবে উপলব্ধি করার সুযোগ পাবেন।  সব শেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছে শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই, এভাবে রাজপথ বন্ধ করে জনগনকে কষ্ট  দিয়ে  লাভ হয় কার?

আরও পড়ুন