বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জনগণ কেন ‘অপশন’ চায়?

Dablu-Bhaiমহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহলম থেকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলছে। তবে কোনদিকে চলছে তা একমাত্র জনগণই বলতে পারবে। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারার কথাও প্রচারিত হয়ে আসছে। সরকারী দলের পক্ষ থেকে বলা হয় মানুষের মধ্যে নাকি এসেছে প্রাণচাঞ্চল্যতা। সরকার বলছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার নাকি এখন বিদেশে একটা উন্নয়নের মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ইতিবাচক বলেও বলা হয়ে থাকে। তবে একথা সত্য যেভাবেই হোক বা যে কারণেই হোক দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত। পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন এভাবে শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে এগিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সকল ভালোর মধ্যেও রয়েছে কিছু কিছু মন্দ। সেই মন্দের বিরুদ্ধে সরকারকে লড়াই করতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নয়নে যদি সরকারের সফলতা থেকে থাকে তাহলে জনমত কেন দিন দিন যাচ্ছে সরকারের বিপক্ষে? বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি কখনো চিন্তা করেছেন? এত কষ্টের পরও ফলাফল কেন ভিন্ন পথে? এর জন্য দায়ী কে? কেন এমন হচ্ছে? কেন এমন হবে?

একথা সত্য যে অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা একসময় বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। এই কারণে বিরোধী দলগুলোর উপর জনগণের সমর্থন বর্তমানে দুর্বল। কিন্তু তাই বলে জনগণ যে সরকারের সমর্থক তা ঠিক নয়। বরং সরকারের বিরুদ্ধে সর্বস্তরে একটি চাপা বিক্ষোভ ও অস্থিরতা দিন দিন দানা বেধে উঠছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা সরকারের ছত্রছায়ায় অবস্থান করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থের পাহাড় গড়ছেন। দেশের অনেকেই এখন সরকারের ভেতরে থাকা কিছু মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাদের কার্যকলাপে অসন্তষ্ট। এব্যাপারে কোনো কিছু না করার কারণে ধীরে ধীরে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। তাই আজ অনেকে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এখন মন্ত্রিপরিষদ ও দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি হয়ে পরেছে। আর অপেক্ষা না করে এখন পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকরাই এখন বলতে শুরু করেছেন দেশ এখন যেভাবে চলছে তাতে বিপক্ষ শক্তিই ভবিষ্যতে লাভবান হবে। দেশের জনগণ এখন ‘অপশন’ চায়।

শেখ হাসিনা আর দশ জন মানুষের মতই একজন মানুষ। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে পিতার স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষে তিনি সংগ্রাম করে যাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু কেন জানি না মনে হচ্ছে তার এই চলার পথে নিজ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ থেকেই মূলত আসছে প্রতিবন্ধকতা। বঙ্গবন্ধুর সময় অবস্থাটা পুরোপুরি এমন না হলেও দলীয় নেতাদের কার্যকলাপের জন্য ঐসময়ও সরকারকে অনেক বেকায়দার মধ্যে পড়তে হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের ভুলগুলো বড় করে প্রচার করেছিল তত্কালীন বিরোধী দল জাসদ। এব্যাপারে জাসদ ওই সময় জনগণের এক বিরাট সমর্থনও আদায় করে নিতে সামর্থ হয়েছিল। সে তুলনায় আজ দেশের বিরোধী দল দুর্বল হওয়ার কারণে সরকার বিরোধী আন্দোলনে এগিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। বিরোধীদলের এই অপারগতা সরকারের জন্য ইতিবাচক হয়ে দাড়িয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার সরকারের ভুলগুলো জনগণের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরার সুযোগ আসছে না। পরিস্থিতি পক্ষে থাকা সত্বেও বিরোধী দলগুলোর নিজস্য সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে কোন ধরনের সংগ্রামে অগ্রসর হতে পারছে না। সরকারকে এজন্য ভাগ্যবান বলতে হবে। তবে বিরোধী দলগুলোর এই দুর্বলতা সরকারের জন্য ইতিবাচক হলেও জনগনের কাছে সরকারের এই ভুলগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। জনগনের ভেতরে সরকারের বিরুদ্ধে একটা চাপা বিদ্রোহ দানা বাধছে বলে অনেকে মনে করছেন। রাজনীতির মাঠে বিষয়গুলোকে গুরত্বসহকারে না দেখে সরকারের চুপ করে বসে থাকা কিংবা এড়িয়ে যাওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত একটু ভেবে দেখা উচিত বলে আজ  আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্খীরা মনে করেন।

মিডিয়ার মতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারী দলের নেতা কর্মী ও জাতীয় সংসদ সদস্যরা তাদের ক্ষমতার অপবেবহার করা সত্তেও দল ও সরকার থেকে কোনো কার্যকর বেবস্থা নিতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার সমর্থিত এসকল জনপ্রতিনিধিদের অনেকেরই নিজস্য নির্বাচনী এলাকায় তাদের জনপ্রিয়তার ধস পরেছে বলে বলা হয়ে থাকে। অনেকের অবস্থা এমন পর্যায়ে যে তারা এখন তাদের নিজ নিজ এলাকায় বসবাস না করে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে সাংগঠনিক কাজে যখন এধরনের সংসদ সদস্য ও নেতারা কখনো কখনো এলাকায় যেতে বাধ্য হন তখন তারা নিরাপত্তার অভাবে পুলিশ কিংবা নিজস্ব বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জনগনের প্রতিনিধি হিসেবে যারা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান না করে ঢাকায় বসবাস করছেন তারা  আবার জন প্রতিনিধি হয় কি করে? এধরনের রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অ্যাকশন না নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের নিরবতা সরকারের জনপ্রিয়তার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। এদের কারণেই মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রযাত্রা বাধার সৃষ্টি করছে বলে আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্খীরা অনেকে মনে করেন।

ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি সর্বোপরি সন্ত্রাস সহ বিভিন্ন বেআইনী কার্যকলাপ মিডিয়ায় আসাতে সরকারের প্রতি জনগনের আস্থা কমে আসছে বলা যেতে পারে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের সার্বিক উন্নতিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে অন্যদিকে দলীয় নেতা এমপি ও কিছু মন্ত্রীর কুকর্মের জন্য সরকারকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। বিষয়গুলোকে সরকার ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ক্ষমতা কারো হাতে চিরদিন থাকে না। গণতান্ত্রিক নিয়মে একদিন না একদিন ক্ষমতার পরিবর্তন অবশ্যই আসবে। তবে ইতিহাস বলে জনগনের আস্থাই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তিকে ধরে না রাখতে পারলে কোনো বাহিনী দিয়ে কোনো সরকারকে অতীতে যেমন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি  ভবিষ্যতেও হবে না বলেই অনেকে মনে করেন। এই কারণেই বিলম্ব না করে সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে চালাতে হবে শুদ্ধি অভিযান। বঙ্গবন্ধুর সময় ছাত্রলীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান ঢাকার পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজদের একটা তালিকা প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। বর্তমান ছাত্রলীগ কি পারে না এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে?

আরও পড়ুন