বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, সাম্প্রতিক সব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোকেরা জড়িত বলেই খুনিরা ধরা পড়েনি।
শনিবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরপর খালেদা জিয়াও তাদের বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যত লোক হত্যা হয়েছে, একটাও কি ধরা পড়েছে? তার পেছনের কারণটা হলো, যে এরা সব তাদের দলীয় লোকজন। আওয়ামী লীগের যারা আছে, তাদের মধ্যেও হয়তো ভালো অনেকে আছে, তাদেরও বলতে হবে যে ভাই আসেন, আমরা তো বাংলাদেশি, যুদ্ধ করলাম, দেশটাকে স্বাধীন করলাম, এখন কি দেশটাকে ধ্বংস করব? আসেন, আপনাদের যারা এসব করতে চায়, তাদের সঙ্গে না থেকে আসুন আমরা যারা দেশটাকে ভালোবাসি, সকলে আমরা একসঙ্গে হয়ে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশটাকে গড়ার জন্য আমরা কাজ করি, এগিয়ে নিয়ে যাই।’
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ মুখে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তারা ধর্ম নিরপেক্ষতা বিশ্বাস করে না। তাই যদি হতো তাহলে সব ধর্মের মানুষকে হত্যা করত না। তাদের মনে যে কি আছে তা জানা কঠিন। আওয়ামী লীগের আমলে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কোনো ধর্মের মানুষ নিরাপদ নয়। শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নয়, ব্যাংক লুটপাট, রিজার্ভ চুরি, বিদেশে অর্থপাচার, গুম-খুন আর দুঃশাসনের মাধ্যমে দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে সরকার।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিই হচ্ছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশপ্রেমিক দল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের কী ভূমিকা ছিল? সেটাও তো নয়। তারা আবার রাজাকার বলে? মুক্তিযুদ্ধের সময় তো তারা স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে সাহস পায় নাই। স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ করেছে এদেশের মানুষ। আর তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আরাম আয়েশ করেছে। সেই দল মুক্তিযুদ্ধের দল হয়েছে। যুদ্ধ না করলে যোদ্ধা হয় কী করে? ফলে মুক্তিযোদ্ধা তারা নয়, মুক্তিযোদ্ধার দল হলো বিএনপি।’ জিয়াউর রহমান স্বয়ং যুদ্ধ করেছেন।’
বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ না করেই তার সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেন, ‘যার স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিলো তিনি তো পাইপ-টাইপ নিয়ে চলে গেলেন পাকিস্তানে। সেখানে আরামেই দিন কাটালো। তার দলের নেতা বার বার বলেছিলেন রেকর্ড করে দিয়ে যান। তিনি সেটাও করেননিই। তিনি সব সময় চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা চেয়েছেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন জিয়াউর রহমান।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘ওই টাকা হ্যাকাররা নেয়নি, চুরি হয়েছে, লুট করা হয়েছে। ফিলিপাইনে ক্যাসিনোতে সেই টাকা নিয়ে হালাল করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামও উল্লেখ না খালেদা জিয়া বলেন, ‘তার ছেলের অ্যাকাউন্টে যে তিনশ’ মিলিয়ন ডলার অর্থ আছে- সে কথাটা সকলে জানে না, এটা সকলকে বলতে হবে তো। এটা কার টাকা? জনগণের টাকা। আর যদি তার টাকা হয়, সে কীভাবে পেল- তা বলতে হবে তো, হিসাব দিক। জবাব দিক সে কীভাবে সেই টাকা আয় করেছেন, তা হলে সেটা পরিষ্কার হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা তো ছোট খবর আমরা পেয়েছি। আরও যে বড় বড় কত কী করেছে, একদিন হয়তো জানা যাবে। দেশ তো শেষ যাচ্ছে তা বুঝতে হবে। এভাবে সব নিয়ে তারা চলে যাবে। আর আমরা শুধু চেয়ে থাকব খোলা আকাশ দিকে, তা তো হতে পারে না।’
দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে খালেদা জিা বলেন, এখন গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা নেই। ভিন্ন মত প্রকাশ করলেই সে মামলা খাবে, রাজাকার হয়ে যাবে। আর না হলে সন্ত্রাসী বানিয়ে তার ওপর অত্যাচার চালাবে। এখন ওরা যেমন খুশি সবার সম্পত্তি দখল করছে, সম্পদের মালিক হচ্ছে।
চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘এই দেশে কোনো নির্বাচনের পরিবেশ আছে? বা যে নির্বাচন হয়েছে এটাকে নির্বাচন হওয়া বলবেন? কীভাবে ভোটকেন্দ্রে, যা আমরা অতীতে কখনো দেখি নাই, পুলিশ কিংবা সরকারি অফিসিয়ালরা ব্যালট পেপারে সিল মারে। ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। আর আওয়ামী লীগের লোকেরা অস্ত্র নিয়ে চলছে।’
এক তরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসন কায়েম করছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সকলের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েও একলা থাকবে শুধু। কোনো দল থাকবে না। কাউকে থাকতে দিবে না। এভাবে তারা চলছে। এটা হতে পারে না। এটা গণতন্ত্র নয়।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসিকে ‘বোবা-কালা’ আখ্যা দিয়ে তার কঠোর সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া । তিনি বলেন, ‘এখন প্রধান সিইসি বলছেন, নির্বাচন করতে গেলে ট্যাংক লাগবে। এতদিনে তিনি বুঝেছেন ট্যাংক লাগবে। সে জন্যেই বিএনপি বলেছে, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হলেও জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। তাহলে সেখানে সেনাবাহিনী ট্যাংক চালাতে পারবে।’
অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, সু মঙ্গল ভিক্ষু, সাচিং ভ্র জেরী, দয়া নন্দ ভিক্ষু, শান্তি রক্ষিত থের, সুশীল বড়ুয়া, চন্দ্রগুপ্ত বড়ুয়া, প্রবীণ চন্দ্র চাকমা, সনত তালুকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান প্রমুখ।


