বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

PM-Call-on-02বাংলাদেশের উন্নয়ন জন্য যুক্তরাজ্য সব ধরনের সহায়তা দেবে এবং পাশে থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। শুক্রবার জাপানের নাগোয়ার ইসে শিমায় অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ব্রিটিশ সরকারপ্রধান এ প্রতিশ্রুতি দেন।

শেখ হাসিনা উন্নত বিশ্বের সংগঠন জি-৭ এর আউটরিচ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য বৃহস্পতিবার জাপান যান।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক বলেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য আমাদের উন্নয়নের জন্য একটি পরিক্ষিত বন্ধু ছিল, আছে এবং থাকবে।

পররাষ্ট্রসচিব আরও জানান, শুক্রবার শেখ হাসিনা জি-৭ আউটরিচ প্রোগ্রামে অত্যন্ত ব্যস্ত দিন অতিবাহিত করেন। সকালে আউটরিচ অনুষ্ঠানে তিনি স্বাস্থ্য, মানসম্মত অবকাঠামো, নারী ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর তার বক্তব্য রাখেন।

সরকারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডেভিড ক্যামেরন ও শেখ হাসিনার বৈঠকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে যাওয়া বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা বা না থাকার বিষয়ে ক্যামেরন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অভিমত জানতে চান।

এই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্যে সৃষ্ট বিতর্কের কথাও উল্লেখ করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “এখন বিশ্বায়নের এই যুগ, যোগাযোগের যুগ। এই যুগে একটি বড় ইউনিয়ন থেকে সরে আসাটা চিন্তা করার বিষয়।”

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এটি ব্রিটিশ জনগণের সিন্ধান্ত। তবে তিনি মনে করেন, যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকা উচিত।

প্রবাসী বাংলাদেশি এবং জনগণের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা করে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা উচিত। কিন্তু ব্রিটিশ জনগণকেই সব শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার বিষয়ে সে দেশের তিন এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, রূপা হক এবং রুশনারা আলীর জনমত সৃষ্টি করার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

এছাড়া বৈঠকে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

ব্রিটেনের অর্থনীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের বিষয় নিয়েও কথা বলেন দুই দেশের দুই সরকার প্রধান।

বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাতে উন্নীত হওয়ার পেছনের ইতিহাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জানতে চেয়ে তার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসাও করেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী।

ক্যামরন বলেন, তার দেশ বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে চায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, মূখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদ ও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

এর আগে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনা গার্ল সামিটে যোগ দিতে লন্ডন গেলে সেখানে ডেভিড ক্যামেরনের বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে তাদের মধ্যে বৈঠক হয়।

অর্থনীতি, সামাজিক ও নারী উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতির ‘ভূয়সী প্রশংসা’ করে সেই বৈঠকে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

এই সাফল্য কীভাবে এল- তা দেখতে বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন ক্যামেরন।

গতবছর যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে ক্যামেরনের দল কনজারভেটিভ পার্টি পুনর্নির্বাচিত হলে তাকে অভিনন্দন  জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সংসদ সদস্য যুক্তরাজ্য যেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়সের সদস্য থাকে, সে জন্য প্রচারণা  চালানোয় শেখ হাসিনা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক অনেক পুরোনো এবং বিভিন্নমুখী। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি বাজার। প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বাস করেন।

বিশ্ব নেতাদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব
জি-সেভেন আউটরিচ মিটিংয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ‘স্পষ্ট হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ।

জাপানের নাগোয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির সাত পরাশক্তির জোট জি-সেভেনের সম্মেলনের পরদিন শুক্রবার এই আউটরিচ মিটিং হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজি, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অলন্দ, জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং এবারের সম্মেলনের আয়োজক জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সকালে নাগোয়ার কাশিকো দ্বীপে শিমা কানকো হোটেলে এই বৈঠকের বিষয়ে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানান মুখ্য সচিব আজাদ ও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।

এই বৈঠকে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যায় মুখ্য সচিব বলেন, “বাংলাদেশ ছাড়া যে দেশগুলেকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে তাদের সবাই কোনো না কোনো গ্রুপকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে আমাদের যে উল্লেখযোগ্য অবদান, সেজন্য বাংলাদেশকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।”

বাংলাদেশ ছাড়াও লাওস, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাপুয়া নিউ গিনি ও শাদের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা আউটরিচ বৈঠকে এশিয়া ও আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণে এসেছেন আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারপারসন এবং বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ এর প্রধানরাও।

বৈঠকের দুটি সেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মূলত চারটি বিষয় নারীর ক্ষমতায়ন, মানসম্মত অবকাঠামো, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কথা বলেছেন বলে পররাষ্ট্র সচিব জানান।

এই চার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে দাবি করে মুখ্য সচিব বলেন, “বড় বড় অবকাঠামো আমরা যেভাবে করছি, নারীর ক্ষমতায়নে আমরা রোল মডেল, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় নেওয়া পদক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছেন এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নারী ও শিশু মৃত্যু রোধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়েছে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের গুরুত্ব বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।”

শহীদুল হক বলেন, “এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ প্রধানমন্ত্রীর গ্লোবাল ইমেজ এবং এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে একটি দৃষ্টান্ত; এই দৃষ্টান্তের একটা স্বীকৃতি।”

বৈঠকের শুরুতেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেছেন।

নারীর ক্ষমতায়ন, গুণগত অবকাঠামো, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সেবায় বাংলাদেশের অর্জন এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন।

“প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেছেন, উন্নত দেশগুলো যদি কারিগরি সহায়তা, অর্থায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, তাহলে বিশ্ব আজকে যে সব সমস্যায় পড়ছে, সেটা পড়বে না।”

বিভিন্ন বড় প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “অবকাঠামোর ক্ষেত্রে আমরা অনেক বড় দিকে যাচ্ছি। যোগাযোগের পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণার কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।”

পরিবেশবান্ধব জ্বালানির গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।

স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে বলতে গিয়ে আউটরিচে শেখ হাসিনা ৩০ হাজার মাতৃসদনের মাধ্যমে নারীদের সহায়তা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখে-স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

গুণগত স্বাস্থ্য সেবা তৃণমূল পর্যায়ে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় তা নিয়েও আলোচনা করেন শেখ হাসিনা।

নারী ক্ষমতায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনীতিতে নারী- এই জায়গায় বাংলাদেশ একটা অবস্থান তৈরি করেছে।

তিনি নারী ক্ষমতায়নের একটা নতুন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মন্তব্য করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, নারীর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বাড়ি-একটি খামারের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। সমাজে নারীর মর্যাদা ও অধিকারের কথাও বলেছেন।

বিশ্বব্যাপী নারীর মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থা নিয়ে বৈঠকে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি।

জি-সেভেনের সম্মেলনের পাশাপাশি আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে আলোচনার জন্য জোটের বাইরে থেকে বিভিন্ন দেশকে আলাদা বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একেই বলা হচ্ছে জি-সেভেন আউটরিচ মিটিং।

এই মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।

এর আগে ২০০১ সালে ইতালিতে জি-এইটের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে কথা বলেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন