তিন বছর আগেপাচার হয়ে আসা শিশু সোনুর বাবা-মা আগামী সপ্তাহে দিল্লী থেকে বাংলাদেশে আসতে পারেন। পাসপোর্ট না থাকায় তাদের আসতে দেরি হচ্ছে। এমনটাই জানিয়েছেন যশোর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রের সাইকো সোসাল কাউন্সিলর মো. মুশফিকুর রহমান।
কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা সোনুই দিল্লির সোনু। যে তিন বছর আগে দিল্লি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল ৭ বছর। আদালতের মাধ্যমে যশোর কিশোর অপরাধ সংশোধনী কেন্দ্রে সোনুকে ৭ মাস আগে পাঠানো হয় বলে জানান মো. মুশফিকুর রহমান।
তিনি জানান, সোনু হিন্দি তেমন বলতে পারেনা। তবে বোঝে। বাংলাতেই সে এখন কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অন্য শিশুদের মত কান্নাকাটি করে সোনু।
মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বরগুনার কামাল ইবনে মুছা ভারত গিয়ে সোনুর বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। রবিবার মুছা সংশোধন কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছেন, পাসপোর্ট না থাকায় সোনুর বাবা-মা বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। তবে আগামী সপ্তাহে তারা বাংলাদেশে আসতে পারেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে মুশফিকুর বলেন, ‘মুছার ফোনে চার্জ না থাকায় সোনুর বাবা-মার ফোন নম্বর দিতে পারেনি। মুছা রবিবারই নিজ বাড়ি বড়গুনাতে ফিরে গেছেন বলে জানান মুসফিকুর রহমান।’
মুছার নম্বরটি চাইলে জানানো হয়, তার ফোনটি হারিয়ে গেছে-এমন অন্য একটি নম্বর থেকে ফোন করে এমন খবরই দিয়েছেন মুছা। এই মুছাই সোনুর বিষয়টি প্রথম প্রশাসনকে জানান।
সাইকো সোসাল কাউন্সিলর আরো জানান, তারা (সোনুর বাবা-মা) এসে প্রথমে সোনুকে সনাক্ত করবে। তারপর আইনী প্রক্রিয়া শেষ করার পর সোনুকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
এদিকে মুছার কিছু কর্মকাণ্ডে সন্দেহর জন্ম দিয়েছে। ফোনে চার্জ না থাকা, সোনুর বাবার নম্বর না দেওয়া ও পরক্ষণে ফোন হারিয়ে যাওয়া-সব মিলিয়ে মুছাকে নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
২৬ মে কিশোর অপরাধ সংশোধনী কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান, সোনুকে বরগুনার আদালত থেকে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। নিরাপদ হেফাজত হিসেবে তাকে এখানে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে জানা যায় তার বাড়ি ভারতে। সে পাচারের শিকার হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আমরা অনেক চেষ্টা করে তার অভিভাবকদের সন্ধান পেয়েছি। অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ভারতের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা এসে তার তথ্য নিয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে ভারতীয় দূতাবাস থেকে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের নির্দেশনায় সোনুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা।
সোনুকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টুইট করেছেন। তিনি ওই বার্তায় লিখেছেন, বাংলাদেশে আমাদের জয়েন্ট সেক্রেটারি সুপ্রিয়া রঙ্গনাথান এরই মধ্যে সোনুর বাবা মেহবুব ও মা মুমতাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা দাবি করছেন, সোনু বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। ঢাকায় আমাদের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা যশোর সফর করবেন। সেখানে যশোরস্থ পুলেরহাট এলাকায় কিশোর অপরাধ সংশোধনী কেন্দ্রে অবস্থান করছে সোনু। মেহবুব ও মুমতাজ দম্পতি সোনুকে তাদের সন্তান বলে দাবি করছেন। তাদের সঙ্গে সোনুর ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে মিলিয়ে দেখা হবে। যদি ডিএনএ পরীক্ষায় পজেটিভ রিপোর্ট আসে তাহলে বিলম্ব না করে সোনুকে ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
সোনুর সম্পর্কে জানার জন্য যশোর পুলেরহাট কিশোর অপরাধ সংশোধনী কেন্দ্রে যাওয়া হয়। সেখানে সোনুসহ কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১০ সালে ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি থেকে নিখোঁজ হয় সোনু।
সোনু বলে, এক মহিলা তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এরপর সে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বরগুনা জেলায় এক বাড়িতে থাকতো। সেখানে তাকে দিয়ে ভারি কাজ করানো হত। এরপর সোনু সেখান থেকে পালিয়ে আসে। পরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সোনু। পুলিশ তাকে আদালতে পাঠায়। আদালত সেখান থেকে যশোর কিশোর কেন্দ্রে পাঠায়।
বর্তমানে সে ওই কেন্দ্রের স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ইতিমধ্যে ক্লাসে সবার মন জয় করে শ্রেণি অধিনায়কও নির্বাচিত হয়েছে সোনু। শিক্ষকদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছে এই শিশু সোনু।
সরেজমিনে ঘুরে সোনুর সম্পর্কে যে সময় খোঁজ খবর নেওয়া হয়, সে সময় সোনু বারবার তার বাবা-মা কাছে যাওয়ার জন্য অকুতি জানাচ্ছিল। তার চোখের পানি থামছিলই না। কবে সে মা-বাবার কাছে যেতে পারবে এমন প্রশ্ন ছিল বারবার।
তার সহপাঠিরা জানায়, ওর বাড়ি ভারতে। ওকে পুলিশ এখানে দিয়ে গেছে। ও আমাদের সঙ্গে ভালো আছে। খেলাধুলা করার পাশাপশি লেখাপড়াও করে। সোনুকে তার অভিভাবকদের কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য আমাদের স্যাররা চেষ্টা করছেন।
ওই কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে শিশুটি নিখোঁজ ছিল। পরে পুলিশ আমাদের কাছে শিশুটিকে নিয়ে আসার পর আমরা তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। পরে তার পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। তারা বাংলাদেশস্থ ভারতীয় হাইকমিশনে যোগাযোগ করে। আমরা এখন তাকে তার মা বাবার প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে সোনুর বাড়ি ফেরা।
কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালিত পাঠশালার প্রধান শিক্ষক বাবুল হোসেন জানান, ৬ মাস আগে সংশোধন কেন্দ্রে আসে সোনু। আমরা জানতে পারি তার বাড়ি ভারতে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সে হারিয়ে গেছে। ছোট মানুষ হিসেবে তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। সে নিয়মিত স্কুলে যায়। পড়াশুনা করে। ক্লাসের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে সে।


