বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

আদালত দেখালো তারা কতো ক্ষমতাবান: ব্যারিস্টার রফিক

দেশের দু’জন প্রধানমন্ত্রীর একজন বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। অপরজন উদ্বোধন করেছিলেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে মহাপ্রতাপে দাঁড়িয়ে থাকা বহুল আলোচিত অবৈধ ওই ভবনটি ভেঙে ফেলার আদেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের ওই রায়ের পর বিজিএমইএ-এর আইনজীবী ও দেশের প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এটার মধ্য দিয়ে আদালত দেখালো তারা কতো ক্ষমতাবান!

বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চের রায় শেষে সাংবাদিকদের তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘হাইকোর্ট বলেছিল বিজিএমইএ ভবনটা ভেঙে দিতে হবে। অ্যাপিলেট ডিভিশন আজ সেটা কনফার্ম করেছে। তার মানে বিল্ডিংটা ভেঙে দিতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই বিল্ডিংটা ভেঙে দিলে অর্থনীতিতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ আমাদের পুরো অর্থনীতি খাড়া হয়ে আছে তৈরি পোষাক শিল্পের ওপর।’

আশুলিয়ায় সংগঠনটির জমি আছে এমনটি আদালত বললেও তা মানছেন না ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। দুজন প্রধানমন্ত্রীর একজন এক প্রধানমন্ত্রী এটার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং আরেকজন উদ্বোধন করেছিলেন। এরপরও তা ভেঙে দেয়ার রায় হওয়ায় তিনি মন্তব্য করেন, ‘এটার মধ্য দিয়ে আদালত দেখালো তারা কতো ক্ষমতাবান!’

রায়ের পর এই মামলায় হাইকোর্টের অ্যামিকাস কিউরি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘হাতিরঝিলের লেকটিতে সৌন্দর্য বর্ধনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই ভবনের কারণে সেই সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এটি একটি বিষফোঁড়া।’

আদালত প্রশ্ন করেছে, সরকারি একটি সংস্থার জমি আরেকটি সংস্থা কিভাবে বিজিএমইএ-কে বরাদ্দ দেয়? আদালত মন্তব্য করেছে- জলাধার আইন অনুযায়ীও লেক দখল করে ভবন গড়ে তোলা অবৈধ। আপিল খারিজ হওয়ার পর সরকার যে কোনো সময় এটা ভাঙতে পারে।

অপরদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আদালতের এই আদেশ ভুমিদস্যুদের হাত থেকে জলাশয় রক্ষার আন্দোলনকে আরো বেগবান করবে। সমাজে যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছে সেক্ষেত্রে এই রায় একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

২০১০ সালের ২ অক্টোবর একটি ইংরেজি দৈনিকে ‘নো প্ল্যান টু ডেমোলিস আনঅথারাইজড বিজিএমইএ বিল্ডিং সুন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর পরদিন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ডিএইচএম মনির উদ্দিন প্রতিবেদনটি হাইকোর্টের নজরে আনেন।

এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) ‘ভবনটি ভাঙ্গার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না’ জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এ রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

রায়ে বলা হয়, ভবন ভাঙার সব ব্যয় বিজিএমইএ-কেই বহন করতে হবে। এছাড়া এই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়া হয়। ওই ভবনের জায়গাসহ রাজধানীর কাওরান বাজারের বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল প্রকল্প মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন
করতে হবে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেন।

রায়ে আরো বলা হয়, জলাধার সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে রাজধানীর হাতিরঝিলে নির্মিত বিজিএমইএ ভবনের নকশার অনুমোদন নেই। জরুরি অবস্থার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভবনটি ভাঙ্গার উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা অক্ষত থেকে যায়। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ রাজউক সেনা সদস্যদের সহায়তায় বিজিএমইএ ভবনের সামনের টিনশেড স্থাপনা ভেঙ্গে দেয়।

তারপর হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে ২০১৩ সালের ২৩ মে লিভ টু আপিল দায়ের করেন বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মালিকানাধীন এই জায়গা বিজিএমইএ-র নিজস্ব ভবন করার জন্য বিক্রি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ২০০০ সালে জলাধার সংরক্ষণ আইন হলেও তা লঙ্ঘন করে নির্মিত হতে থাকে এ ভবন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভবনটির উদ্বোধন করেন।

আরও পড়ুন