নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনার আগে তাদের যেভাবে অপহরণ করা হয়েছিল আদালতে তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন র্যাবের প্রত্যক্ষদর্শী দুই কর্মকর্তা। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে তাদের সাক্ষ্য নেয়া হয়।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় হত্যাকাণ্ডের মামলার মূল আসামি সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৩ আসামি উপস্থিত ছিলেন। শুনানি শেষে আগামী ২০ জুন পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাত খুনের ঘটনায় সোমবার (১৩ জুন) দুইজনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। তারা হলেন- র্যাব-১১ এর করপোরাল অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) পলাশ গোলদার।
আদালত সূত্রমতে, সাক্ষ্য দেয়ার সময় এসআই পলাশ গোলদার জানান, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি র্যাব-১১ এর ডিএডি আবদুস সালাম শিকদারের নেতৃত্বে টহল টিমে ছিলেন। সেদিন বেলা ১১টার তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে চেকপোস্ট বসায় এবং গাড়ি তল্লাশি শুরু করে। দুপুর দুটার দিকে সাদা রঙ ও কালো রঙের গাড়ি দুটি আমাদের প্রায় একশ গজ সামনে এলেই গাড়ি দুটিকে ওভারটেক করে নীল রঙয়ের মাইক্রোবাসটি সামনে এসে থামে। তখন মেজর আরিফ স্যার ও তার সাথে থাকা সাদা পোশাকের লোকজন গাড়ি থেকে নেমে সাদা রঙয়ের গাড়ির যাত্রীদের তার গাড়িতে তুলে নেন। পিছনের কালো রঙয়ের গাড়ি থেকে এমএম রানা আরো দুজন যাত্রীকে মাইক্রোবাসে তুলে নেন। তারা কালবিলম্ব না করে মাইক্রোবাসটি ও সিলভার কালারের গাড়িটি নিয়ে ঢাকা লিংক রোডের সাইনবোর্ডের দিকে চলে যান। পরে আমাদের ক্যাম্প কমান্ডারের নির্দেশে আমরা ক্যাম্পে চলে আসি। পরবর্তীতে গণমাধ্যমে জানতে পারি যে, যাদের স্টেডিয়ামের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তারাই শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া ভিকটিম।
অন্যদিকে, সাক্ষ্য দেয়ার সময় করপোরাল জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তিনি তখন আদমজী ক্যাম্পে ডিউটি অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। ২৭ এপ্রিল দিনগত রাত দুটায় এএসপি মেহেদী স্যার ফোন করে জানান তিনি ফোনে কাউকে পাচ্ছেন না। দ্রুত যেন দুটি গাড়ি শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ঘাটে পাঠানো হয়। সে মোতাবেক আমি নির্দেশনা দেই।
মামলা সূত্রমতে, চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা হয় দুটি মামলা। একটি মামলার বাদী বিজয় কুমার পাল হলেন নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের মেয়ে জামাতা ও অপর বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি হলেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী। দুটি মামলাতেই অভিন্ন সাক্ষী হলো ১২৭ জন করে। এ কারণে উভয় মামলার সাক্ষীদের একই সঙ্গে দুই মামলায় জেরা করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও পহেলা মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্ত শেষে প্রায় এক বছর পর গত ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাত খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে এখনো ১২ জন পলাতক রয়েছে।


