বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

রমজানের রাতেও থেমে থাকে না ওদের কাজ…

Night Life Dhakaইফতার শেষের আড্ডা গড়িয়ে রাত সাড়ে ১০টা। টনক নড়লো অনেকেরই, বাসায় ফিরতে হবে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতেই কেটে গেলো আরো আধা ঘণ্টা।

ধানমণ্ডি ২৭, রেড টমেটো থেকে হাঁটতে হাঁটতে রাপা প্লাজা। ২৭ নম্বর সিগন্যালে বাস দাঁড়াতেই লাফিয়ে উঠে পরলাম। বাসে তেমন যাত্রী নেই, বেশিরভাগ সিট ফাঁকা। বরাবরের মতো আজও একদম পিছনের ছিটে বসলাম। সিগন্যাল ছাড়তেই একটানে আসাদ গেট। যাত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে টেকনিক্যল-গাবতলী বলে অহেতুক চেঁচাচ্ছে হেল্পার। ড্রাইভারটাও জন্মের ঠ্যাটা। ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে জানালা দিয়ে বের হয়ে বাসের ছাদে উঠে গেলো। যাত্রীরা নিরুত্তাপ, বসে রইলো…।

পাশেই ফুটপাতের দেয়াল ঘেঁষা সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে ছিল একজন। রাঙা ঠোটে রহস্যের হাসি নিয়ে চতুর দৃষ্টি। শরীরের বিশেষ অঙ্গ-প্রতঙ্গ থেকে শুরু করে সাজসজ্জায় যথেষ্ট বাড়াবাড়ি। চারপাশে কেউ কেউ আবার ঘুরঘুরও করছে। আড় চোখে দেখছে, ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা।

এরমধ্যে বাসের সামনের সিটের যাত্রীটি যে কলা দেখালেন, তার প্রশংসা করতেই হয়। জানালার ভাঙা কাঁচ সরিয়ে নাকের ভেতরের কফগুলো সজোরে টেনে মুখের ভেতর এনে সশব্দে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে কি যে এক কলা প্রদর্শন করলেন। সঙ্গে সঙ্গেই ফুটপাতের সেই ‘হুর’ গটগট করে হেঁটে বাসে উঠে এলো!

জানলার কাঁচ সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে আমার সামনের সিটে বসলো সে। সামনের সিটের লোকটাও এসে বসলো তার পাশে। তাদের মধ্যে কিসব কথা চালাচালিও হলো। পুরুষ কণ্ঠটি একটু শোনা গেলো, বলছে- ‘কল্যাণপুর নতুন বাজারের কাছে। মেস বাসা। তিনজন। কত নিবা?’

ততোক্ষণে বাস চলতে শুরু করেছে রোলার কোস্টারের গতিতে হেলে দুলে। সামনের সিটে কি কি যেন ঘটছিল। দেখেও না দেখার ভান করে থাকতে হয়। হঠাৎ মনে হলো কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে। জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। চাপা কণ্ঠে কেউ বলছে- ‘রাস্তাঘাটে বজ্জাতি করবি না। যা করবি বাসায় নিয়া কর।’ কে শুনে তার কথা। অবাধ্য কাম। পরাস্ত হল দৈহিক পেশাজীবী।

আচমকা, বজ্রের মতো চপেটাঘাত পড়লো লোকটির গালে। সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক কষে থেমে গেলো বাসটিও। শ্যামলী বাসস্টপ, নেমে গেলো লোকটি। আরো কিছু যাত্রী উঠলো।

টেকনিক্যাল মোড়, বাস থেকে নামলাম। পাইকপাড়া যেতে চাচ্ছে না কোনো রিকশা। হাঁটতে হাঁটতে বাঙলা কলেজের গেট। ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় দাঁড়ানো মেয়েটি শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিল- ‘আর মাত্র দুইশ টাকা হলেই বাসা ভাড়া দিতে পারতাম। মাসের ১৭ তারিখ। ভাড়া দিতে না পারলে বাড়িওয়ালা বের করে দিবে। বাড়িওয়ালার গালাগালি ভাল্লাগে না। কি যে করি!’

মনে পড়ে গেলো, বাসা ভাড়া তো দেয়া হয়নি! কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম রিকশার আশায়। দৃষ্টিকোণের মধ্যে কোনো রিকশা নেই, একটি মেয়ে এবং আরো কিছু দূরে একজন পথচারী হেঁটে আসছে এদিকে।

…হট্টগোল শুনে এগিয়ে গেলাম। পাঁচ-ছয়জন লোক এবং একটি মেয়ের বাকবিতণ্ডা। বাসের সামনের সিটের বিশেষ কলার অধিকারী লোকটিকে চিনতে পারলাম। বলছে- ‘বাসা ভাড়া দিতে পারছে না শুনে মায়া লাগলো। বললো আর মাত্র দুইশ টাকা হলেই হয়। ভাবলাম একশ টাকা দিয়া সাহায্য করি। আল্লার কছম…’

‘চুপ, বদমাইশ। মেয়েলোক দেখলে মাথা ঠিক থাকে না? ভাই এই বদমাইশের কথা শুনেন না। একা দাঁড়ায়া আছি দেখে এই বেটা আমার কাছে আসে। পকেট থেকে একশ টাকা বের করে খারাপ প্রস্তাব দেয় আমাকে। রাজি না হলে জোর করতে থাকে। তখনই আমি চিল্লাই’, বলছিল মেয়েটি।

সঙ্গে সঙ্গে চার-পাঁচজন বেধড়ক কিলঘুষি মারতে শুরু করলো ওই লোকটিকে। টেনেহিঁচরে শার্টটিও ছিঁড়ে ফেললো। লোকটির মোবাইল, মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিল।

এবার মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো- সে আপনের কি হয়?
-কিছু না।

-তাইলে দাঁড়ায়া আছেন ক্যান? এখান থেকে যান!

আরও পড়ুন