অভিজিৎ, টুটুল ও দীপনের পর এবার উগ্রপন্থিদের নিশানা দুই বাংলার প্রচ্ছদ শিল্পী চারু পিন্টুর (প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ আল কাফি) দিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ফ্যান পেজে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এ নিয়ে রাজধানীর আদাবর থানায় বুধবার সাধারণ ডায়েরি করেছেন তিনি। নোবেল বিজয়ী গ্রন্থের (অনুবাদ) প্রচ্ছদ শিল্পী চারু পিন্টুর রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের লেখক ও শিল্পীদের সঙ্গে রয়েছে তার পেশাগত সম্পর্ক। এমন শিল্পীকে জঙ্গিদের নিশানা করার কারণ এখনও খুঁজে পায়নি আইনশৃংখলা বাহিনী।
চারু পিন্টু আদাবরে থাকেন। জিডিতে লিখেছেন, ৩ জুন রাত ১০টা ৩৬ মিনিটে ফেসবুক ফ্যান পেজে অপরিচিত এক আইডি থেকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু বিষয়টি তিনি মঙ্গলবার রাতে টের পান। তার ধারণা, কোনো উগ্রপন্থি বা জামায়াত-শিবির এ হুমকি দিয়েছে। চারু পিন্টু আরও লিখেন, তিনি কোনো ব্লগে লেখালেখি করেন না। বিশ্বাস করেন না নাস্তিকতাও। ধর্মবিদ্বেষী কোনো বিষয়ের সঙ্গেও যুক্ত নন। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী। এ কারণে তাকে মৌলবাদীরা টার্গেট করতে পারে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও জোনের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, চারু পিন্টুর অভিযোগের বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইটি সংক্রান্ত সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের যা করণীয় তাই করা হবে। তাকে হুমকি দেয়ার কারণ অনুসন্ধান চলছে।
চারু পিন্টুকে হুমকিদাতা বলেছে, ‘তোরে কুত্তার মতো করে মারা হবে। ওরে মুক্তমনা… তোকে কুপিয়ে মারবো… এবার তোর পালা।’ হুমকির পরে ওই আইডি নিষ্ক্রিয় করে দেয় হুমকিদাতা।
পরে চারু পিন্টু ফেসবুকে দেয়া পোস্টে লিখেন, ‘… এবার নাকি আমার পালা। মেসেজ দিয়ে আইডি বন্ধ করে রাখছে। কে দিল বুঝতে পারলাম না। …আমি ক্যামনে মুক্তমনা হইলাম? আমি তো জীবনেও ব্লগে লিখি নাই। আর ধর্ম নিয়েও কখনও উল্টাপাল্টা বাজে চিন্তাও করি না।’
এরপরই হুমকিদাতার উদ্দেশ্যে চারু লিখেন, ‘আমি হরিদাস পাল না যে কোপাতে আসবি। আমি রেডি আছি, পারলে কোপা আর কোপাতে আসার আগে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসিস। তোর জন্য আমিও রেডি আছি। আমরা কলাগাছের মতো না, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে প্যান্ট পরার আগে থেকেই তোদের সঙ্গে লড়াই করে আসছি। আন্ডার গ্রাউন্ড না হয়ে সামনে আয়। চাপাতি তোর আছে আর আমাদের কি শক্তি নেই? এখন লড়াই আর কারও উপরে ভরসা করে নেই। ভাবিস না তোরা কোপাবি আর আমরা ঘরে বসে রবীন্দ্র সংগীত গাইতে থাকব? বি কেয়ারফুল।’
চারু পিন্টু যুগান্তরকে বলেন, তিনি বিষয়টি আইনশৃংখলা বাহিনীকে জানিয়েছেন। কি কারণে এ হুমকি দেয়া হয়েছে তা জানা নেই। উগ্রপন্থিরা এখন বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষকে টার্গেটে করছে। সেই তালিকায় হয়তো আমাকেও ফেলেছে। কিছুটা অনিরাপদবোধ করছেন বলেও জানান এ প্রচ্ছদ শিল্পী। তিনি মনে করেন, উগ্রপন্থিরা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার পেতে তাকে হত্যার টার্গেট করেছে।
যশোর জেলার মনিরামপুরে পিন্টুর বাড়ি। তিনি প্রচ্ছদশিল্পে অবদান রেখে চলেছেন তুলির আঁচড়ে। ২০০৪ সাল থেকে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ ও লিটল ম্যাগে নান্দনিক প্রচ্ছদ এঁকে চলেছেন। ৮ হাজারেরও বেশি প্রচ্ছদ তৈরি করেছেন তিনি। ২০০৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ডোরিস লেসিংয়ের দ্য গ্রাস ইজ সিঙ্গিং, ২০১৫ সালে নোবেল বিজয়ী সোয়েতলানা আলেক্সসিয়েভিচের উপন্যাস চেরনেবি (চেরনোবিলের আর্তনাদ) এবং নোবেল বিজয়ী হার্টা ম্যুলারের অনুবাদগ্রন্থেরও প্রচ্ছদ এঁকেছেন তিনি।
এর আগে মুক্তমনা ব্লগের লেখক ড. অভিজিৎ রায়, তার বইয়ের প্রকাশক দীপন ও টুটুলের ওপর হামলা করে জঙ্গিরা।


