বগুড়ার শিবগঞ্জে বানাইল মহাশ্মশান দখল হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক ক্ষমতার দাপটে এর একাংশ মাটি ভরাট করে সেখানে মার্কেট নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রতিবাদ না করতে তার ক্যাডাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ ফুঁসে উঠেছেন। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে শনিবার উপজেলা সদরের চিকাদহ এলাকায় এক ঘণ্টা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুর রহমানের কাছে স্মারকলিপি দেন তারা।
স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, অবিলম্বে প্রশাসন তাদের মহাশ্মশান পুরোপুরি উদ্ধার করে না দিলে এলাকার সব হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রয়োজনে এ এলাকা ত্যাগ করবেন। এ ছাড়া দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাইলে ওই আওয়ামী লীগ নেতা দখলের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ওই জায়গা জনৈক ওসমান মোল্লার মালিকানাধীন। তিনি নিজের জায়গায় লোকজন নিয়ে মাটি ভরাট করছেন।
বানাইল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির আয়োজনে শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ওই মানববন্ধন কর্মসূচি হয়। বানাইল ছাড়াও আঁচলাই, উথলী, সংসারদীঘি, পরানপুর, ভাইয়ের পুকুর, বামনা এলাকার বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ও শিশু এতে অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বানাইল মৌজার করতোয়া নদীর তীরসংলগ্ন এ শ্মশানটিতে ১৯১০ সাল থেকে লাশের সৎকার চলে আসছে। এটি জমিদার পত্নী নগেন্দ্র বালার নামে সিএস ৮৭ দাগের সম্পত্তি। সিএস-এমআরআর এবং সর্বশেষ মাঠ জরিপেও তা বহাল আছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুল হক মহাশ্মশানের উত্তর পাশের বেশ কিছু এলাকা দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সেখানে তিনি মার্কেট নির্মাণ করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি মাটি ভরাট না করতে মৌখিকভাবে নিষেধ করেন। কিন্তু শনিবারও দখল বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মানববন্ধন ভণ্ডুল করতে ওই আওয়ামী লীগ নেতার পেটোয়া বাহিনীর সদস্য পরিচিত শাহ আলম ও রিমন নামের দুই যুবক শুক্রবার রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি রাম নারায়ণ কানু জানান, করতোয়া নদীর পাশে ২৫ শতক জমিতে প্রাচীন এ শ্মশানটি অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এখানে লাশ সৎকার করা হচ্ছে। শ্মশানসংক্রান্ত সব কাগজপত্র তাদের হাতে রয়েছে। এর আগে জনৈক ওসমান মোল্লা কিছু জমির মালিকানা দাবি করলেও তিনি তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু ওসমান মোল্লা নাম ব্যবহার করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক সেখানে মাটি ভরাট ও দখলে নেয়ার পাঁয়তারা করছেন।
বানাইল কেন্দ্রীয় বারোয়ারি শিবমন্দির ও শ্মশান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র সরকার জানান, শ্মশানের জায়গা রক্ষায় তারা সোচ্চার হলে ওই আওয়ামী লীগ নেতার রোষানলে পড়েন। এর আগে এ বিষয় নিয়ে কথা বললে তাকে হুমকি-ধমকি দেয়া হয়। এতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন। অবিলম্বে এ দখল প্রক্রিয়া বন্ধ করা না হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। অবিলম্বে শ্মশানের দখল প্রক্রিয়া বন্ধ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, করতোয়া নদীর ঘাট পাকাকরণ এবং সড়কবাতি স্থাপনের দাবি জানানো হয় মানববন্ধনে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিশির সাহা, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি প্রহলাদ সরকার, সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র অধিকারি, বানাইল কেন্দ্রীয় বারোয়ারি শিবমন্দির ও শ্মশান সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি শ্রীকৃষ্ণ মোহন্ত, থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এসএম তাজুল ইসলাম, প্রবীণ সাংবাদিক রতন কুমার রায়, বগুড়া জেলা হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক গৌরব চন্দ্র দাস, ব্যবসায়ী অদ্বৈত কুমার মোহন্ত, গোপাল চন্দ্র মোহন্ত, সাধন কুমার দত্ত, মিলন মোহন্ত, রাজ কুমার কানু, অখিল কুমার সরকার, সমর কুমার মোহন্ত, অধির কুমার দেব, বিপ্লব মোহন্ত প্রমুখ।
সরেজমিন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, গত ১৫ দিন ধরে এই জমি দখলের কাজ চলছে। শিবগঞ্জ-পিরব সড়কে বানাইল মৌজার চিকাদহ এলাকায় করতোয়া নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে এই শ্মশানের পাশে প্রায় ২’শ বছরের প্রাচীন একটি বট গাছ ছিল। সেখানেই চলতো হিন্দুদের পুজা অর্চনার কাজ। সম্প্রতি ঝড়ে গাছটি ভেঙে পড়লে শ্মশানের দক্ষিণ ভাগের অংশটি ফাঁকা হয়ে যায়। প্রধান সড়ক ঘেঁষা এই জায়গাটি পরবর্তী সময়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আজিজুল হকের নজরে পড়ে।
আশেপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, ১৫ দিন হলো সভাপতির লোকজন সেখানে মাটি ফেলে ভরাট করছেন। আমরা শুনেছি সভাপতি এই জায়গাটি কিনে নিয়েছেন। এখন মার্কেট করে ভাড়া দিবেন। বেশ কয়েকদিন মাটি ভরাটের সময় সভাপতি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ তদারকি করেছেন। এ সময় তার সঙ্গে ক্যাডার বাহিনীও ছিল।
বানাইল বারোয়ারী কেন্দ্রীয় শিবমন্দির ও শ্মশান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র সরকার জানান, করতোয়া নদীর পাশে ২৭ শতক জমিতে তাদের প্রাচীণ মহাশ্মশান। দীর্ঘদিন ধরে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃতদের সৎকার করা হচ্ছে। শ্মশান সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র তাদের আছে। জনৈক ওসমান মোল্লা কিছু জমির মালিকানা দাবি করলেও তিনি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হকের নেতৃত্বে সড়কের পাশে শ্মশানের মূল্যবান জমি দখল শুরু হয়। বর্তমানে সেখানে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ওই স্থানে থাকা একটি প্রাচীন বটগাছ সম্প্রতি ঝড়ে ভেঙে গেলে সেটিও আওয়ামী লীগ সভাপতি নিয়ে যান।
দুলাল চন্দ্র আরো অভিযোগ করেন, শ্মশানের জায়গা রক্ষায় তারা সোচ্চার হলে সভাপতির রোষানলে পড়েন। মানববন্ধন কর্মসূচি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে দুই তিন দিন আগে আজিজুল হক হুমকি ধামকি দেন। এতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রাম নারায়ন কানু বলেন, ইংরেজি ১৯১০ সাল বা তারও আগে থেকে বানাইল মৌজার করতোয়া নদীর ধার ঘেঁষে এই শ্মশানটিতে মৃতদেহের সৎকার চলে আসছে। এটি জমিদার পত্মী নগেন্দ্র বালার নামীয় সিএস ৮৭ দাগের সম্পত্তি। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মৃতদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে অথবা মাটিতে গর্ত করে সমাধীস্থ করার শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। বানাইল মহাশ্মশানে উভয় পন্থাতেই মৃতদেহের সৎকার করা হয়ে আসছে। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ওই সম্পত্তি আমাদের অর্থাৎ হিন্দু জনসাধারণের ব্যবহার্য সম্পত্তি হিসাবে গণ্য হয়ে আসছে এবং সর্বশেষ মাঠ জরিপও তারই স্বাক্ষ্য বহন করছে।
ইংরেজি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় জমিদার নগেন্দ্র নাথ সরকার স্ব-পরিবারে ভারতে চলে যান এবং বাংলাদেশে আর ফিরে আসেননি। জমিদারের ফেলে যাওয়া সব সম্পত্তিই পরিত্যক্ত সম্পত্তি গণ্য করে পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করেন। তারপর খাস খতিয়ানের অর্ন্তভূক্ত করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পত্তনী (লিজ) দেন। কিন্তু ধর্মীয় আইন অনুযায়ী মন্দির, মসজিদ, মঠ শ্মশান-গোরস্থান পত্তনী (লিজ) দেয়া আইনসঙ্গত নয়।
সম্পত্তির রকম গোপন করে অর্থাৎ নালিশী সম্পত্তি আবাদযোগ্য মর্মে ওসমান মোল্লা আরো অনেক সম্পত্তির সঙ্গে বানাইল মৌজার সিএস ৮৭ দাগের বানাইল মহাশ্মশানের জমিটিও ৬৬ (১২) ৬৬-৬৭ নং সেটেলমেন্ট কেস মূলে পত্তনী (লিজ) গ্রহণ করেন ১৯৬৭ সালে। পত্তন (লিজ) নেবার দীর্ঘ ১৭ বছর পরে তিনি বানাইল মহাশ্মশান দখল নিতে গেলে তখন হিন্দু জনসাধারণ বাঁধা দেয়।
ওই লিজ কেস বাতিলের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বগুড়া কার্যালয়ে ৭(১৩) ৮৩-৮৪ মিসকেস করা হয়। ওই মিস কেসে নালিশী সম্পত্তি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে শ্মশান প্রমাণিত হওয়ায় কথিত লিজটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। লিজ বাতিলের বিরুদ্ধে লিজ গ্রহণকারী ওসমান মোল্লা বিভাগীয় কমিশনারের বরাবরে ১৯৯/৮৪ নং আপিল দায়ের করেন। বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী আপিলটি শুনানি শেষে ২১-০১-১৯৮৫ তারিখে খারিজ করেন। এরপর হিন্দু জনসাধারণ শান্তিপূর্ণ ভাবে বানাইল মহাশ্মশান ব্যবহার করে আসছেন।
জানা গেছে, শিবগঞ্জ পৌর এলাকা ঘোষিত হওয়ার পর বানাইল মহাশ্মশানের জমির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। পৌর এলাকার প্রধান সড়ক সংলগ্ন হওয়ায় এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও চাহিদা অনেক। যার কারণে অনেকেরই লোলুপ দৃষ্টি এই বানাইল মহাশ্মশানের জমির প্রতি। এর আগেও ১৯৮৫ সালের পর কথিত লিজ গ্রহীতা ওসমান মোল্লাকে সামনে রেখে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক ওই সম্পত্তি দখল করতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের আন্দোলনের মুখে সেটি পারেননি। সর্বশেষ বানাইল মহাশ্মশানের জায়গায় ঝড়ে উপড়ে পড়া একটি প্রাচীন বটগাছ কেটে নিয়েছেন। এখন তিনি ওই গাছটির স্থানটিসহ উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত বানাইল মহাশ্মশানের বেশকিছু জায়গা অবৈধ দখলের চেষ্টা করছেন।
এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক বলেন, ওইটা খাস জায়গা। ওসমান মোল্লা নামের একজনের লিজ নেয়া। তিনি বলেন, আমি ওসমান মোল্লার কাছে থেকে জায়গা কিনে নিয়েছি। এরপর সেখানে মাটি ফেলেছি। যারা আন্দোলন করছে তাদেরকে বলেছি কাগজপত্র নিয়ে বসতে। প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতেও রাজি আছি।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনুর রহমান জানান, বানাইল মহাশ্মশানের জায়গা দখলের ব্যাপারে তার কাছে অভিযোগ এসেছে। তিনি অভিযোগ পেয়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া জায়গাটি দখল না করতে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে অনুরোধ করেছেন। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।


