বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

সুখের সংসার তছনছ ঝরনা রানীর

jharna Raniসকাল পৌনে ৯টা পর্যন্ত সবই ছিল ঠিকঠাক। তবে এরপর যা ঘটে গেল তা কখনো কল্পনাই করতে পারেনি ওই পরিবারের কেউই।

বড় ছেলে বাসুদেব ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। তার প্রিয় খাবার বানাতে ব্যস্ত ছিলেন ঝরনা রানী ভৌমিক। বিশেষ দিন, তাই ছোট ছেলে শুভদেবও নানা বায়না ধরেছে বিশেষ কিছু খেতে। সকালের রান্না শেষ না হতেই দুপুরের রান্নার চিন্তায়ও ব্যস্ত ছিলেন ঝর্ণা। সকালে পরিবারের সবার চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। কিন্তু একটু পরেই সেই আনন্দ পরিণত হলো বিষাদে। বুলেট কেড়ে নিয়েছে ঝর্ণা রানীর জীবন। একই সঙ্গে পরিবারের সুখ ও শান্তি।

গত বৃহস্পতিবার সকালে ঈদুল ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল কিশোরগঞ্জসহ গোটাদেশজুড়ে। সকাল পৌনে ৯টা। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে তখন লাখ লাখ মুসল্লির সমাগম। চলছিল নামাজের প্রস্তুতি। ঈদগাহ মাঠের পশ্চিম দিকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে আজিমউদ্দিন স্কুলের পাশে সবুজবাগ গলির মুখে জঙ্গি হামলায় দুজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর একটু পরেই সবুজবাগ মহল্লায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এ সময় ভৌমিক নিবাসের শোবার ঘরের ভেতরেই মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ঝর্ণা রানী ভৌমিক। তার স্বামী গৌরাঙ্গ ভৌমিক শহরের একটি বিড়ি ফ্যাক্টরির একজন অল্প বেতনের কর্মী।

শুক্রবার কিশোরগঞ্জ শহর ও শোলাকিয়া ঘুরে দেখা গেছে, শোকে মুহ্যমান শোলাকিয়া ও গোটা কিশোরগঞ্জ। চারদিকে শোকাতুর পরিবেশ। সবাই যেন হতভম্ব, বিস্মিত, শোকাহত। ঝর্ণা রানীর মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তারা। এলাকাবাসীর প্রশ্ন- কোন অপরাধে প্রাণ গেল নিরপরাধ এই নারীর। তিনি তো কারও শত্রু ছিলেন না। জঙ্গি, সন্ত্রাসী, পুলিশ, গুলি, বোমা কিছুই বুঝতেন না তিনি। কেন এমন একটি সুখী পরিবার তছনছ হয়ে গেল? শোলাকিয়ার সবুজবাগ গলির বাসায় ঘটনার পর থেকেই ঝর্ণা রানীর শোকগ্রস্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে সাধারণ মানুষ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিরা আসছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাতেই প্রবোধ মানছেন না পরিবারের সদস্যরা। যাকেই কাছে পাচ্ছেন হাহাকার করে উঠছেন তারা। ঝর্ণা রানীর ছেলে বাসুদেব ভৌমিক বলেন, কার গুলিতে মা মারা গেছেন সেটা তো আমরা দেখিনি। আর আমরা যে এ বিষয়ে কথা বলবো সে নিরাপত্তা কোথায়?

ঘটনার বর্ণনায় ঝর্ণা রানীর পরিবার ও এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে দুই ছেলের জন্য পায়েশ তৈরি করেন ঝর্ণা রানী। এরই মধ্যে বাইরে শুরু হয়ে যায় গোলাগুলি। তবে, প্রাথমিকভাবে ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পারেননি তারা। রান্নাঘরে তখন লুচি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঝর্ণা রানী। এরই মধ্যে বড় ছেলে বাসুদেব ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে স্নানের জন্য লুঙ্গি চান মায়ের কাছে। মা ঝর্ণা বেগম শোবার ঘরের ভেতরে গিয়ে খাটের স্ট্যান্ডে রাখা লুঙ্গি হাতে নিয়ে ঘুরতেই একটি গুলি জানালা ভেদ করে তার মাথার বাম দিকে।

ঝর্ণা রানীর স্বামী গৌরাঙ্গ ভৌমিক বলেন, কোন চিৎকার নেই, আওয়াজ নেই। শুধু ধপ করে একটি শব্দ। গুলিটি বাম দিকে কানের পাশে ভেদ করে বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে আমি জাপটে ধরি। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। একটি চোখ কোঠর থেকে বেরিয়ে যায়। এর একটু পরেই আমার স্ত্রীর শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। তিনি আরো জানান, দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এভাবেই চলে। বাইরে তখন যুদ্ধাবস্থা। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও কোনো উপায় ছিল না। এভাবে থাকার পর দুপুরের দিকে স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিকদের অবহিত করেন তারা। পরে সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে রাতেই স্থানীয় শ্মশানঘাটে ঝর্ণা রানীর লাশ দাহ করা হয়।

গৌরাঙ্গ ভৌমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছোট চাকরি। বেতন যা পাই তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। ছোট ছেলেটির (শুভদেব ভৌমিক) পড়ার খরচ বাঁচাতে তার মা নিজেই তাকে দুই বেলা পড়াতো। অনেক কষ্ট করে ছেলেটিকে মানুষ করতে চেয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমি কার কাছে বিচার চাইবো। ভগবান কেন আমার প্রতি এত অবিচার করলেন। তিনি বলেন, এই ছেলেকে এখন কে দেখবে? কে মানুষ করবে? আমি সারাদিন থাকবো বাইরে। বড় ছেলে চলে যাবে ঢাকায়। এই ছেলেকে কে আদর করে খাওয়াবে? গৌরাঙ্গ ভৌমিক আরো বলেন, আমার যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানাই আমার ছোট ছেলেটির যাতে লেখাপড়া বন্ধ না হয়।

পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা জানান, গৌরাঙ্গ ভৌমিকের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি ঝর্ণা রানীকে বিয়ে করেন। সাধারণত সৎ মায়ের সংসারে সন্তানরা অনাদর আর অবহেলা পান- এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু ঝর্ণা রানী ছিলেন এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম। নিজের গর্ভের ছেলে শুভদেবকে তিনি যেমনভাবে দেখতেন ঠিক সেভাবেই দেখতেন অন্য ছেলে বাসুদেবকেও।

শুভদেব ভৌমিক (১২) কিশোরগঞ্জে আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। মা মারা যাওয়ায় স্তব্ধ হয়ে গেছে শুভদেব। তার মুখে কোনো কথা নেই।

স্বজনরা বলছেন, মা হারানোর যন্ত্রণা এখনও বুঝতে পারছে না শুভদেব। বড় ছেলে বাসুদেব রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। তিনি বলেন, বাবার সীমিত আয়। কিন্তু আমার মা আমাদের কখনও অনাদরে রাখেননি। আমাদের জন্য তার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। কিন্তু মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার এমন মৃত্যু আমরা সইতে পারছি না।

ঝর্ণা রানীর জা বেবী ভৌমিক বলেন, সাধারণত সৎ ছেলের প্রতি মায়ের আদর থাকে না- আমরা এমনটিই জানি। কিন্তু তার বেলায় এ কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা দেখেছি তার মন ছিল উদার। দুই ছেলেকেই সমানভাবে আদর করতেন তিনি। মৃত্যুর আগেও তিনি তা দেখিয়েছেন। ঘুণাক্ষরেও আমরা ভাবতে পারিনি এমনভাবে তিনি চলে যাবেন।

তিনি বলেন, মা মারা যাওয়ায় ছোট ছেলেটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল। অপর জা গীতা ভৌমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঝর্ণার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল খুবই ভালো। তার মতো মানুষ হয় না। তার এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না। ঝর্ণা রানীর দেবরের ছেলে সুশান্ত ভৌমিক বলেন, এ মৃত্যুতে এলাকাবাসীসহ গোটা কিশোরগঞ্জ শোকে কাতর হয়েছে। কিন্তু আমরা কার কাছে প্রতিকার চাইবো?

ভৌমিক নিবাসের পাশের বাসিন্দা একটি সরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিরেন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, এমন করুণ মৃত্যু আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছে। সরকার যেন এই পরিবারটির দিকে নজর দেয়।

আরও পড়ুন