বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

প্রয়োজনে আলাদাভাবে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলব: ফখরুল

52dd30006ec08-4_29776জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে আমাদেরকে বাইরে রেখে জাতীয় ঐক্য করা হলে আমরাও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আলাদাভাবে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলব। বলেছেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপিকে বাদ দিয়ে উগ্র ও জঙ্গিবাদ সংকট সমাধান সম্ভব নয় বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

রাজধানীর ইঞ্জিনির্য়াস ইনস্টিটিউটশন মিলনায়তনে আজ মঙ্গলবার বিকেলে এক শোক সভা এ কথা বলেন তিনি। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে এই শোকসভার আয়োজন করে ঢাকা মহানগর বিএনপি।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, বিএনপিকে বাদ দিয়ে সেই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতাসীনরা যদি বিএনপিকে ছাড়াই জাতীয় ঐক্য তৈরি করে, সেক্ষেত্রে বিএনপি দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’

দলমত নির্বিশেষে ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ নামক দানবকে পরাজিত করতে আবারও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান বিএনপির এই নেতা।

জঙ্গিবাদকে অভ্যন্তরীণ সমস্যা ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার দেশে সংঘটিত প্রতি ঘটনার প্রকৃত তথ্য উৎঘাটন না করে বিএনপিসহ বিরোধীদলকে জড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে কোনো খেয়াল নেই, তাদের খেয়াল শুধু বিএনপিকে কীভাবে ধ্বংস করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়।

‘কিন্তু বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করে। দেশের প্রায় ৭০-৮০ ভাগ লোক বিএনপির সমর্থক। কাজেই বিএনপিকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য এবং চলমান সংকট সমাধান সম্ভব হবে না।’

সভায় বিএনপির মহাসচিব ফখরুল বলেন, “আমাদের নেতৃবৃন্দ বার বার বলে আসছেন, বিষয়টাকে হালকা করে দেখবেন না। এটা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের আজকে যে উদ্ভব হয়েছে, তার একটা সম্পর্ক রয়েছে।

“উনারা (সরকার) এটাকে উড়িয়ে দিলেন। উড়িয়েই শুধু দেননি, এর সঙ্গে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনীতিকে জড়িত করলেন।”

এর মধ্য দিয়ে আসল অপরাধীরা পার পাচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, “উদ্দেশ্য একটাই আসল সত্যটাকে ধামাচাপা দেওয়া; তাদের আড়াল করে আজকে বিএনপিকে দোষারোপ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে হাসিল করা।”

গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে জঙ্গি হামলায় নিহত ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনের প্রাণহানিতে দল ঘোষিত শোক দিবসে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ওই সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব।

শোক সভার শুরুতে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন উপস্থিত বিএনপি নেতা-কর্মীরা। সভায় কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি শোক প্রস্তাব উত্থাপন করলে নেতা-কর্মীরা হাত তুলে তাতে সম্মতি জানায়।

এই দিবসে বিএনপির কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়, ওড়ানো হয় কালো পতাকা, নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন।

গুলশানে নিহতদের প্রতি শোক জানিয়ে ফখরুল বলেন, “আমরা শোক প্রকাশ করছি। আমরা ওই ঘটনায় শোকাভিভূত, আমরা আতঙ্কিত।

“তবে এখান থেকে আমাদের শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আসুন, আমরা আমাদের জনগণের কাছে যাই, তাদের মধ্যে সেই চেতনার জাগরণ ঘটাই যে আমরা সত্যিকার অর্থেই একটা সন্ত্রাসমুক্ত, উগ্রবাদমুক্ত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চাই।”

বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে খালেদা জিয়ার ডাকে সরকারকে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান ফখরুল।

“এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ যেটা আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আসুন সব কিছু ভুলে গিয়ে আমরা একত্রিত হই, এক হই, এই ভয়ংকর দানবকে আমরা প্রতিহত করি।”

তার শর্ত হিসেবে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’ ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব।

“সেটা কখনোই সম্ভব হবে না, যদি না গণতন্ত্রকে আপনি চলতে দেন, যদি না জানালা-দরজাগুলো খুলে দেন, যদি না আমাদের কথা বলার সুযোগটা সৃষ্টি না করেন।এই লড়াইয়ে হাতিয়ার হচ্ছে জনগণ, হাতিয়ার হচ্ছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্রবিহীন অবস্থায় সেটা পারা যাবে না।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সমালোচনাও করেন ফখরুল।

“এই রোজার সময়ে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ দমন করার কথা বলে আপনারা (সরকার) ১৬ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছেন, যার মধ্যে ৫ হাজারের উপরে বিএনপির নেতা-কর্মী আছে। আপনারাই বলেছেন, এর মধ্যে জঙ্গি বলে সন্দেহ করা গেছে ১৮৯ জনকে। তাহলে বাকি কারা? কাদের ধরলেন? কারা গুলশানে গিয়ে ঘটনা ঘটাল? কারা গুপ্ত হত্যা ঘটাল? সেই সত্য তো এখন পর্যন্ত উদ্ঘাটন করতে পারেননি।”

গ্রেপ্তার জঙ্গিদের কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করে নেপথ্যের অপরাধীদের আড়াল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইউটিউবে নানা প্রচারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বাংলাদেশের তরুণদের প্ররোচিত করা হচ্ছে মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, “সেখানে যে ভাষায় কথা বলেছে, আমরা আতঙ্কিত হয়েছি। এই যদি হয় ইসলামের কথা, সেই ইসলাম তো ইসলাম নয়। ওরা কারা? তাদের উদ্দেশ্য কী? কী করতে চায় তারা?

“তারা ব্যবহার করছে আমাদের তরুণ কোমলমতি যুবকদের। তাদের ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করে ভুল রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে। এটাকে শুধু এককভাবে আইনশৃঙ্খলার কথা বলে দমন করা যাবে না। এটাকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে হবে।”

শোকসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, “জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ এই সময়ে একটি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। এদের কোনো রাজনীতি নাই।

“দেয়ার ইজ নো মিলিটারি সলিউশন টু দিস প্রবলেম। জোর করে গোলা-বারুদ দিয়ে, র‌্যাব-পুলিশ এমনকি সেনাবাহিনী দিয়ে এই জঙ্গিবাদ উগ্রবাদ দমন করা সম্ভবপর হবে না। যতদিন না পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই উগ্রবাদকে প্রতিহত না করে।”

সরকার ‘ক্ষমতার মোহে’ এই বিষয়টি ‘বুঝতে পারছে না’ বলে দোষারোপের রাজনীতি করে প্রকারান্তরে জঙ্গিবাদকে উৎসাহিত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

“দোষারোপ করার রাজনীতি বন্ধ করুন। বিএনপি একটি উদার মধ্যপন্থি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এই শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে বা একে বাদ দিয়ে আপনারা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, আহমেদ আজম খান, মাহবুবউদ্দিন খোকন, মজিবর রহমান সরোয়ার বক্তব্য রাখেন।

ঢাকা মহানগর বিএনপির আবুল খায়ের ভুঁইয়া, আবদুস সালাম আজাদ, কাজী আবুল বাশার, যুবদলের রফিকুল ইসলাম মজনু, স্বেচ্ছাসেবক দলের ইয়াসীন আলী, মহিলা দলের ফরিদা ইয়াসমীন, শ্রমিক দলের মুস্তাফিজুল করীম মজুমদার, ছাত্রদলের মনিরুল ইসলামও বক্তব্য রাখেন।

শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু, মোহাম্মদ শাহজাহান, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিলকিস জাহান শিরিন, মাহবুবুল হক নান্নু, শহীদুল ইসলাম বাবুল, আবদুল আউয়াল খান, নুরী আরা সাফা, হেলেন জেরিন খান, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।

আরও পড়ুন