ওমানে গৃহকর্মে নিয়োজিত বিদেশী শ্রমিকরা নানা রকম নির্যাতনের শিকার। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশী শ্রমিকও। ‘আই ওয়াজ সোল্ড: অ্যাবিউজ অ্যান্ড এক্সপ্লোয়টেশন অব মাইগ্রেন্ট ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইন ওমান’ শীর্ষক ৬৮ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্টে এ কথা বলা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক এ সংগঠন ওমান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অবিলম্বে অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞামুলক সিস্টেম আছে তা সংস্কার করতে।
অভিবাসী বিষয়ক কড়া আইনের ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা তাদেরকে নিয়োগকারীদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। অন্য খাতে যারা কাজ করেন তাদের সমান আইনি সুরক্ষা গৃহকর্মীদের দেয়ার জন্যও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে পাচার, জোর করে শ্রমে নিয়োজিত করা ও দাসত্বের বিরুদ্ধে তদন্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে ওমানে কালাফা (স্পন্সরশিপ) বিষয়ক অভিবাসী শ্রম ব্যবস্থার কারণে ও শ্রমিকের সুরক্ষার অভাবে অভিবাসী শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নিয়োগকারীরা তাদেরকে শোষণ করছে। প্রহার, যৌন নির্যাতন, বেতন না পেয়ে, অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর কারণে যেসব শ্রমিক পালান তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন। পলানোর জন্য তাদেরকে আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। সন্তানের দেখাশোনা, তাদের খাবার তৈরি ও বাড়িঘর পরিষ্কার রাখার জন্য ওমানের পরিবারগুলো অভিবাসী গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল।
এসব কাজে যেসব অভিবাসী শ্রমিক জড়িত তাদের বেতনের ওপর আবার যার যার দেশে তার পরিবার ও সন্তানরা নির্ভরশীল। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, এসব শ্রমিক নিষ্ঠুর আচরণের শিকার হন। শোষণমুলক পরিবেশে থাকতে হয় তাদের। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নারী অধিকারের গবেষক রতœা বেগম বলেছেন, ওমানে গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তার কথা শুনতে বাধ্য। তাদেরকে কোন বিশ্রাম ছাড়া, বেতন বা খাদ্য ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য করানো হয়। তারা জানেন এসব শ্রমিক যদি পালায় তাহলে তারাই শাস্তি পাবে। তবে নিয়োগকারীকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না বললেই চলে। কমপক্ষে এক লাখ ৩০ হাজার অভিবাসী কাজ করেন সেখানে।
এর বেশির ভাগই বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও ইথিওপিয়ার। ওমানে এদের ৫৯ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। কোন কোন ক্ষেত্রে শ্রমিকরা তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, তাদেরকে শক্তি প্রয়োগ করে কাজ করানো হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমান্তের স্পর্শকাতর স্থান দিয়ে তাদেরকে পাচার করা হয়। শ্রমিকদের ওমানে নেয়ার জন্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে বড় অংকের ফি দেয় নিয়োগকারীরা। কিছু শ্রমিক বলেছেন, নিয়োগকারীরা তাদেরকে বলেন যে, তোমাদেরকে আমরা টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি।
বাংলাদেশের গৃহকর্মী আসমা বলেছেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিলেন কাজনিয়ে। কিন্তু তাকে একজন ব্যক্তির কাছে ‘বিক্রি’ করে দেয় রিক্রুটিং এজেন্সি। ওই ব্যক্তি তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয় এবং তাকে নিয়ে যায় ওমানে। তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা ১৫। ফলে কোন বিরতি ছাড়াই দিনে ২১ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য করা হয় তাকে। যথাযথ খাবার দেয়া হয় না। গালাগাল করা হয়। যৌন নির্যাতন চালানো হয়। এত কাজের পরও তাকে কোন বেতন দেয়া হয় না। আসমা বলেছেন, আমি রাত সাড়ে চারটায় কাজ শুরু করি। তা শেষ হয় পরের রাত একটায়। সারাদিন তারা আমাকে একটুও বসতে দেয় না। যখনই আমি বলি আমি চলে যাব। তখন ওই ব্যক্তি বলেন যে, আমি তোমাকে ১৫৬০ রিয়াল দিয়ে দুবাই থেকে কিনে এনেছি। আমার সেই অর্থ তুমি ফেরত দাও। তারপর খুশিমতো চলে যাও।
এছাড়া বেশির ভাগ শ্রমিক বলেছেন তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছে নিয়োগকারীরা। তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ বেতন দেয়া হয় না। কোন বিরতি ছাড়াই তাদেরকে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করানো হয়। পর্যাপ্ত খাবার পায় না। বাসস্থানের অবস্থাও শোচনীয়। শারীরিক নির্যাতন করা হয়। কয়েকজন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। পরিস্থিতি এতটাই করুণ যে ইন্দোনেশিয়ার মতো কিছু দেশ তাদের শ্রমিক ওমান পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।


