বাবুল আক্তারপুলিশ সুপার বাবুল আক্তার ৩৯ দিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তিনি কি ছুটিতে, নাকি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাব চাওয়া হলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। বাবুল নিজেও চুপ।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বুধবার ১৩ জুলাই বলেন, স্ত্রী মাহমুদা খানম (মিতু) খুন হওয়ার পর থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত এই কর্মকর্তা আর কর্মস্থলে আসছেন না। তিনি ছুটির আবেদনও করেননি; বরং তাঁর পদত্যাগপত্র পড়ে আছে। এটি গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সদর দপ্তর।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘বাবুল আক্তার পুলিশ সদর দপ্তরের লোক। তিনি ছুটিতে আছেন, নাকি চাকরিতে আছেন, সেটা আমি জানি না।’
বাবুলের শ্বশুর সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ হোসেনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
গত ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মাহমুদা। হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। সেই মামলায় ২৪ জুন গভীর রাতে খিলগাঁও নওয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুলকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এরপর ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁকে। স্ত্রী খুন হওয়ার পর থেকে তিনি সেখানেই আছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর তিন কর্মকর্তা বাবুলকে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখনই তাঁর পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। তবে পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করা না-করা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবুলকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, হয় তাঁকে বাহিনী থেকে সরে যেতে হবে, নইলে স্ত্রী হত্যা মামলার আসামি হতে হবে। বাবুল আক্তার বাহিনী থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, এসব ক্ষেত্রে মাঝামাঝি কোনো পন্থা থাকতে পারে না। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে। বাবুল যদি এতে জড়িত হন, তাহলে আর দশজন অপরাধীর যা হয়, তাঁরও তা হবে। আর তা না হলে তিনি সসম্মানে পুলিশ বাহিনীতে থাকবেন। মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া উচিত।
তদন্তের প্রক্রিয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, মাহমুদা খানম হত্যা মামলার তদন্তে বলার মতো অগ্রগতি নেই। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আসামি মনিরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অস্ত্র সরবরাহকারী ভোলাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গ্রেপ্তার বাকি আসামিদের রিমান্ড শুনানি হবে ১৭ জুলাই। খুনের নির্দেশদাতাকে শনাক্ত করা গেছে কি না, এর জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘পরিষ্কার না হয়ে বলতে পারব না।’
আসামিদের মধ্যে নবী ও রাশেদ ৫ জুলাই ভোরে রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। মুছাকে ২২ জুন বন্দর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে বলে দাবি করে আসছেন তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তার। পুলিশ তা অস্বীকার করে বলছে, মুছাকে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে। পলাতক রয়েছেন আসামি কালু। গ্রেপ্তার হয়েছেন ওয়াসিম, আনোয়ার, শাহজাহান, মুছার ভাই সাইদুল শিকদার ওরফে সাকু, অস্ত্র সরবরাহকারী এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা ও ভোলার সহযোগী মনির।
চট্টগ্রাম পুলিশের সূত্র জানায়, হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মো. মনিরকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে। তিন দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ায় আজ বৃহস্পতিবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হতে পারে। গত সোমবার বিকেল থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে বাকলিয়া থানার পুলিশ।
বাবুল আক্তার ১৯৭৫ সালে ঝিনাইদহের শৈলকুপার মদনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবদুল ওয়াদুদ মিয়া ও মা শাহিদা বেগম। ২০০৪ সালে মাহমুদা আক্তারের সঙ্গে সংসারজীবন শুরু করেন। তাদের সংসারে দুই সন্তান আক্তার মাহমুদ মাহির ও আক্তার তাবাচ্ছুম তানজিলা। মাহির ক্যান্টেনমেন্ট পাবলিক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে।
পুলিশের ২৪ তম ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তা বাবুল আক্তার ২০০৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে র্যাব-২-এ কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালী জোনের সহকারী কমিশনার পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি জেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার পদেও কর্মরত ছিলেন।
পরে পদোন্নতি পেয়ে বাবুল আক্তার দীর্ঘদিন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর বদলি হয়ে সিএমপিতে যোগ দেন। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দিয়ে দক্ষিণ সুদান গিয়েছিলেন বাবুল আক্তার। ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই তিনি দেশে ফিরে নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ সদর দফতরে যোগদান করেন।
তবে সিএমপির অপরাধ দমনে আলোচিত চেৌকস পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারকে চাহিদাপত্র দিয়ে সিএমপিতে আনেন পুলিশ কমিশনার আব্দুল জলিল মন্ডল। এরপর ছুটি কাটিয়ে ২৬ আগস্ট সিএমপিতে গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হিসেবে যোগদান করেন।
চলতি বছরের ৫ এপ্রিল তাঁর পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি হলে তিনি সিএমপি থেকে ঢাকা পুলিশ সদর দফতরে যোগদান করেন। ঘটনা এমন হয়েছিল যে- হাটহাজারী এবং কক্সবাজার থেকে বাবুল আক্তারের বদলি ঠেকাতে জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল।
অপরাধ দমনে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে বাবুল আক্তার পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক পিপিএম (সেবা) (২০০৮), ২০০৯ পিপিএম (সাহসিকতা), ২০১০ সালে আইজিপি ব্যাজ, ২০১১ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল পুরস্কার বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (সাহসিকতা)। সর্বশেষ বেসরকারি পর্যায়ে ২০১২ সালে সিঙ্গার-চ্যানেল আই (সাহসিকতা) পুরস্কার লাভ করেছেন বাবুল আক্তার। এর মধ্যে চারবার অর্জন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের সেরা সহকারী পুলিশ সুপারের মর্যাদা।


