বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

শ্মশান দখল করে কসাইখানা: স্থানীয় হিন্দুরা শঙ্কায়

122222অবৈধভাবে শ্মশানঘাটের জায়গায় কসাইখানা নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় প্রতিকারের পরিবর্তে জীবননাশের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় হিন্দুরা। এ কারণে এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষোভে-দুঃখে দেশ ছাড়ার চিন্তাভাবনাও করছেন।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার বলড়া ও মানিকগঞ্জ সদরের ভাড়ারিয়ার দুটো শ্মশানের জায়গাসহ মধ্যবর্তী মরা নদী সংলগ্ন জমিতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অবৈধভাবে কসাইখানা তৈরি করা হয়েছে। এতে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূমিতে আঘাত লাগা ছাড়াও এ ঘটনায় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তবে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও ভয়ে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলছেন না হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। বলড়া ভাড়ারিয়া মাদ্রাসা কমিটি এই কসাইখানা তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম শুধু বাঁশ আর টিন দিয়ে ঘর তোলা হয়। বর্তমানে পাকাপোক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে স্থাপনা। পশু জবাই করার সব বর্জ্য গিয়ে পড়ছে শ্মশানের জায়গার ওপর। এ নিয়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা আর চাপা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।

বলড়ার শ্রী শ্রী রাধারমন জিউর বিগ্রহ মন্দিরের পরিচালক শ্রী অশোক কুমার গোস্বামীর বলেন, ‘দক্ষিণ মানিকগঞ্জে এটিই একমাত্র ও ঐতিহ্যবাহী শ্মাশানঘাট। এটা বিগত দুশো বছর ধরে শ্মাশান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখানকার কোনো হিন্দু লোক মারা গেলে এ শ্মশানে শবদাহ করা হয়। এসএ রেকর্ডেও শ্মশান হিসেবে হিন্দু সাধারণের জন্য ব্যবহার্য হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। এখন থেকে ২১ বছর আগে (১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি) এলাকার জনৈক ডা. সালাম চৌধুরী বড়লা শ্মশানের জমিসহ তৎসংগ্ন খাসজমিতে রাতারাতি জবরদখল করে ঘর তুলেছিলেন। তখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ঘরটি উচ্ছেদ করা হয়। এই কসাইখানা তৈরির পেছনে এর একটা রেশ থাকতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, বলড়া হরিরামপুর এবং ভাড়ারিয়া মানিকগঞ্জ এই দুই মৌজার মুখোমুখি দু’টি শ্মাশান অবস্থিত। মাঝখানে মরা নদী। উদ্ভুত পরিস্থিতির ব্যাপারে প্রশাসনকে জানানোর পরেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকার সুযোগে শ্মশান দুটি উচ্ছেদ করার জন্য কয়েকজন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি উঠে পড়ে লেগেছে।

যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব পাকা কসাইখানা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানান স্থানীয়রা।

এ ব্যাপারে কথা হয় বলড়া ও ভাড়ারিয়া বাজারের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করে তারা বলেন, এই শ্মশান প্রায় দুশো বছরের পুরনো। ভূমি অফিসের রেকর্ডেও দুটি শ্মশান উল্লেখ আছে। এ শ্মশানের জায়গার উপর জোর করে কসাইখানা করা হয়েছে।

তারা আরো বলেন, স্থানীয় মাদরাসাই কসাইখানাগুলো বসিয়েছে। এই সম্পত্তি যদি মাদরাসার হয় বা তাদের কাগজপত্র থেকে থাকে তাহলে কসাইখানা করার কাজে আপত্তি থাকার কথা নয়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন নজর না দিলে পত্রপত্রিকায় লিখে সাংবাদিকরা কিছু করতে পারবেন না।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলম বলেন, ওই শ্মশান প্রায় দুশো বছরের পুরোনো। ভূমি অফিসের রেকর্ডেও দুটি শ্মশান উল্লেখ আছে। শ্মশানের জায়গার উপর যদি জোর করে স্থাপনা তোলা হয় তাহলে ধর্মের উপর আঘাত আনা হবে বলে তিনি মনে করেন। এনিয়ে বর্তমান বড়লা ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলবেন বলে তিনি জানান।

বলড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোছলেম উদ্দিন খান কুন্নু বলেন, শ্মাশানের জায়গায় এভাবে কসাইখানা হতে পারে না। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।

বলড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম তারেক বলেন, বলড়া ভাড়ারিয়া সাতানী কারামাতিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা কমিটি এ কসাইখানা বসিয়েছে। মাদরাসা কমিটি ভাড়া তুলছেন। এটা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনা হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।

কসাই ঠাণ্ডু মোল্লা বলেন, ‘মাদরাসা কমিটি আমাদের বসিয়েছে। এর জন্য মাসে মাসে ভাড়াও দিতে হচ্ছে।’ কসাইখানার জন্য প্রশাসনের কোনো অনুমোদন আছে কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেছেন, ‘আমাদের কাছে মাদরাসা কমিটির মৌখিক অনুমতি ছাড়া কোনো কাগজপত্র নেই। তবে পশু জবাইয়ের সকল বর্জ্য শ্মশানের জায়গায় যাচ্ছে বলে স্বীকার করলেন কসাই ঠাণ্ডু।

বলড়া ভাড়ারিয়া সাতানী কারামাতিয়া মাদরাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বাইরের লোক, এখানে চাকরি করি। এ ব্যাপারে মাদরাসা কমিটি বলতে পারবে। এছাড়া মাদরাসার পাশেই বলড়ার শ্রী শ্রী রাধারমন জিউর বিগ্রহ মন্দির। হিন্দু মুসলিম মিলে আমরা বসবাস করছি। মন্দিরের পরিচালক আমাদের মাদরাসার ছাত্রদের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। আমরাও মন্দিরের কাজে সহায়তা করি।’

মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘কসাইদের টাকা দিয়েই ঘর তুলেছেন তারা। বলড়ার শ্রী শ্রী রাধারমন জিউর বিগ্রহ মন্দিরের গোসাই অভিযোগ দিলে আমরা মাদরাসা কমিটি কসাইদের উঠে যেতে বলি। তখন বড়লা ও ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের দুই চেয়ারম্যান বিষয়টি দেখার দায়িত্ব নেন। এরপর ইউপি নির্বাচন এসে যায়। দু’জনই নির্বাচনে হেয়ে যান। এখন তাদের মন মানসিকতা ভালো নয়। তারপরেও আবার আমরা বর্তমান চেয়ারম্যানদের বিষয়টি জানাবো।’
পুরোনো শ্মশান মঠ

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯৯ সালের ১২ মার্চ মানিকগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক শেখ মোজাহার উদ্দিন বলড়া মহাশ্মশান ঘাটের নাম ফলক উন্মোচন করেন। এর একটু দক্ষিণ পাশে দীর্ঘ দিনের পুরনো শ্মশান মঠ। মঠের গাঁয়ে লেখা, হিন্দু জনসাধারণের ব্যবহার্য মহাশ্মশানের সম্পত্তির তফসিল। সেখানে লেখা আছে- বলড়া মৌজার ১৮৩ দাগের ১৮ শতাংশ, ১৮৪ দাগের ১২ শতাংশ ও ৩২৩ দাগের ১২ শতাংশসহ মোট ৪২ শতাংশ জমি শ্মশানের সম্পত্তি।

ভাড়ারিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আংগুর এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। তাকে কেউ কিছু জানায়ওনি বলেও নিশ্চিত করলেন।

বর্তমান ভাড়ারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, ‘শ্মশানের জায়গায় কসাইখানা না থাকলেই ভালো। সম্মিলিতভাবে উচ্ছেদ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।’

আরও পড়ুন