জাহান রিমা, ফ্লোরিডা (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে
আমার ভাইয়া প্রেম করছে। এই কথা যখন শুনি তখন আমাদের ঘরে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন! বৈশাখ মাস ছাড়াই কালবৈশাখী। এক ঘণ্টার নোটিশে আম্মু খাট থেকে নৌকায়। আব্বুর প্রেশার ১৪০ বাই ১০০।
এই শোকে নীরবতার পোস্টার ঘরের সব মুখদের মুখ জুড়ে। ভয়ানক জোনে আমরা দুজন। আমি আর রীপা। কিছু সময় আসে যখন ঘরের সব রাগ দেখাতে হয় ছোটদের। ঝিকে মেরে বউকে শেখানো টাইপ ব্যাপার। ভীষণ চিন্তায় আমরা দুজন। কী যে হয়! ভয়ে সারা দিন পড়ার টেবিলে কিন্তু পড়ছি না, পড়ায় ঢুকে পড়ছে এক শ একটা কথা।
আল্লা, ভাইয়া প্রেম করে! মেয়েটা কে? দেখতে কেমন? কী লজ্জা, কী লজ্জা। প্রেম করুইন্না ভাইয়া আব্বু-আম্মুর সঙ্গে আজকে রাতে কেমনে বসে ভাত খাবে।
ওদিকে বড় আপুরা ঘটা করে ভাইয়ের জন্য বিভিন্ন মেয়ে দেখতে যেতে পারছে না আর। এই শোকে বিহ্বল। তাদের একটা মাত্র ভাইয়ের বউয়ের এক শ একটা গুণ যাচাই করে ঘরে আনার পরিকল্পনা যে পণ্ড।
এভাবেই দুই দিনে দীর্ঘ জীবনে কাটিয়ে দেওয়া আমাদের ভীষণ আমুদে ঘরটির ভিন্ন এক রূপ দেখলাম। আমার এভারেস্টের মতো দৃঢ় ব্যক্তিত্বের ভাইয়াকে দেখলাম হিমালয়ের জমে থাকা বরফের মতো গলে গলে পড়ছে, টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।
ঘৃণা নয়, সবাইকে ভালোবেসো এই জীবনবোধের শিক্ষা দেওয়া মানুষগুলো আজ কাউকে ভালোবাসে জেনে যে উত্তাপ নিয়ে বসে, তার ভয়াবহতায় ভাইয়ার চোখে এক সমুদ্র জল। মনে হচ্ছে, ইয়েস আর নোর ধাক্কায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে যখন-তখন।
এই প্রথম ভাইয়ার প্রতি ভয়ানক শ্রদ্ধা থেকে সরে এসে করুণা অনুভব করছে ঘরের সর্বকনিষ্ঠ দুজন মেয়ে। ছোট্ট দুই বোন। আমরা দুজন।
এই প্রথম কাজ থাকা সত্ত্বেও ভাইয়া খুব সকালে বাসায় ফিরেছে। আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন। অফিস থেকে এসে টিভির পেছনে হাত দিয়ে টিভি গরম কিনা দেখছে না। টিভি গরম মানে আমরা টিভি দেখেছি, পড়ি নাই। কলিং বেল শুনে আমরা দুই বোন দৌড়ে বই খুলে পড়ার টেবিলে বসে থাকি। সে সবের কিছুই দেখছে না। নিজ ঘরে অপরিচিতর মতো হাঁটছে। আর কারও চোখের দিকেই তাকাতে পারছে না।
এই প্রথম আম্মু ভাইয়াকে ভাত বেড়ে দিতে বসে আছেন। কিন্তু ভাইয়া ভাত খাচ্ছে না। ভাইয়া যে মমতাময়ী মায়ের হাতের শক্ত ভাত স্বচ্ছন্দে খেত, সে ভাইয়া এই প্রথম পাতের নরম ভাতগুলো সহজে গিলতে পারছে না, আম্মু থাকাতে। আমাদের দাদার একান্নবর্তী পরিবারে চিরকালের ঠান্ডা মেজাজের আম্মুর শীতল চাহনির উত্তপ্ততা নিতে পারছে না ভাইয়া।
এমন করেই মাত্র কয়টা দিন কয়েক বছরের মতো লম্বা মনে হলো। দুই চারটা দিন চলে গেল। আব্বু-আম্মু একটা পারিবারিক বৈঠক ডাকলেন। আশ্চর্যজনকভাবে সেই বৈঠকে আমাদেরও রাখা হলো। হয়তো ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে ইচ্ছে করেই রেখেছেন। ভাইয়ের বোন তো। বিশ্বাস কী? যদি প্রেম করে বসে থাকি!
যাই হোক, বৈঠকে প্রধান আসনে আসীন, যুক্তিতে পারদর্শী আমাদের আব্বু। যুক্তি, আবেগ ও কাঠিন্য এই ত্রয়ী শক্তিকে এক কণ্ঠে এনে ভাইয়াকে বললেন, তুমি পছন্দ করেছ। অন্যায় করোনি। আমাদের জানিয়েছ সরাসরি তার জন্যও ধন্যবাদ পাও। আঞ্চলিকতা রক্ষায়, একই অঞ্চলের মেয়ের সঙ্গে একই অঞ্চলের ছেলের বিয়েতে আমরা কতটুকু স্বার্থপর আর যুক্তিহীন তা তুমি জানো। এও জানো, আমরা দ্বীপের মানুষ খুব অঞ্চল প্রবণ। বিভিন্ন সময়ে তোমার বড় বোনের জন্য বিভিন্ন জেলার থেকে আসা অনেক ভালো প্রস্তাব আমরা ফিরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করিনি, শুধু অঞ্চলকেন্দ্রিক প্রবণতার কারণে। সেসব তুমি জানো। তোমার হাতের ওপর দিয়েই সেই প্রস্তাবগুলোর জীবনাবসান হয়েছে। যা হোক, কোন জেলার মেয়ে, বাবা-মাসহ তার মাতৃকুল ও পিতৃকুলের সব তথ্য নির্ভুল এনে দাও। ভালো হলে বিবেচিত হবে।
আম্মু-আব্বুর এই সব কথার অন্তরালে ছিল ভাইয়াকে তিন মাস অবজারভেশনে রাখা। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতি ডেসপারেট কিংবা বেসামাল কিনা তা অবজারভেশনে রাখা। যদিও ভাইয়া মেঝের টাইলসের দিকে চেয়ে সে বৈঠকে বলেছিল, ঠিক আছে। আপনাদের যদি উপযুক্ত মনে না হয় তবে আমি আপনাদের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেব। তবে আমাকে যুক্তি দেখাতে হবে, ঠিক কোন কারণে মেয়েটা আপনাদের পুত্রবধূ হওয়ার উপযুক্ত না এবং কেন নয়?
ভাইয়ার যুক্তিতে যতি কিংবা কমার মতো সামান্যতম ভুল আব্বু-আম্মু পাচ্ছিলেন না।
দশ পনেরো দিন পর ঘরের আবহাওয়া একটু হালকা হলো। আম্মু-আব্বু ভাইয়ার অন্তরালে আলাপ করতে বসল।
হ্যাঁ, ঠিকইতো, ভবিষ্যৎ ছেলের বউয়ের থেকে কোন বিষয়টা চাচ্ছি আমরা? পড়াশোনা—মেয়েটা তো ইকোনমিকসে মাস্টার্স। রেজাল্ট—সেটা চাওয়া বাহুল্য হলেও মেয়েটা তো সব পরীক্ষার রেজাল্টেই ফার্স্ট ক্লাস। চাকরি—তাও তো করছে। ফ্যামিলি—যথেষ্ট এডুকেটেড। দেখতে-শুনতে—সে তো ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের দিনই দেখেছেন আম্মু-আব্বু। ভাইয়ার মানিব্যাগে লুকিয়ে রাখা পাসপোর্ট সাইজের ছোট্ট ছবিটা যেন একটা মায়া দিয়ে বানানো পরি। ভূমির অপ্সরা। এত মায়াময় রূপসী। তবে বাকি থাকে আর কী। ভিন্ন জেলার মেয়ে। সন্দ্বীপের মেয়ে হলেই যে বউ ভালো হবে তার নিশ্চয়তা তো বিধাতাও দিতে পারবে না। ভালো খারাপের মিশেল কোন জেলায় নেই? এই সব আলাপ।
লুকিয়ে লুকিয়ে আমরা দুই বোন সব শুনি ফেলি। আলাপে পজিটিভ টোনের আভাস পেয়ে সে কী আনন্দ আমাদের। ভাইয়ার ছোট্ট দুই বোনের। হয়তো এতে প্রেমের পাত্র বিরিয়ানির পাত্রের মতো হলে ভবিষ্যতে প্রেমের সত্যায়িত ফটোকপি পেতে পারি আমরাও এ জাতীয় দুরভিসন্ধি ছিল। কিন্তু এসব আলাপের কিছুই ভাইয়া তখনো জানে না। জানানো হয়নি। ভাইয়া তখনো ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের ঘূর্ণিতে আছে। ভীষণ চিন্তিত। আপডেট জানার জন্য আকুলি-বিকুলি করছে। তাই সেটা অনুমান করে আমরাও একটু পোজপাজ নিয়ে হাঁটতাম ভাইয়ার সামনে। মনে এই কথা, তুমি মুনশি বহুত শাসনে রাখছ আমাদের। এখন বুঝ শাসন কত মজা…হুহ! আমাদের পেট থেকে ইনফরমেশন বাহির করতে এত কিউট হইছ এখন, না? যাও এখন দূরে গিয়া হাঁট! কিসসু কমু না…হুহ।
ভাইয়াকে কমু না, কইলেও ঠিকই ভাবিকে, ভাবি? হ্যাঁ, নতুন ভাবিকে ইনফরমেশন পাচার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম আমরা। গোপনে ভাইয়ার মোবাইল থেকে নম্বর নিতে গেলাম। কিন্তু সমস্যা একটা হলো। মুক্তি নামের কোনো নামই তো নাই। ও আচ্ছা বলি, ভাবির নাম মুক্তি। মেয়েটার নাম মুক্তি। ভাইয়ার প্রেমিকার নাম মুক্তি! বড় সুন্দর নাম। পরে বহুত কষ্টে উদ্ধার করলাম ভাবির নম্বর। ইবলিসটা ভাবির নাম নিউজ এডিটর নামে সেভ করছে। এই নিউজ এডিটরই তাঁকে রাত বিরাতে কল দেয় অতি প্রয়োজনে।
তো এই নম্বর উদ্ধার অভিযানে সফলতার পরিচয় দিয়ে পত্রিকা অফিসের নিউজ এডিটর না হলেও ভাইয়ার জীবনের ভবিষ্যৎ এডিটরকে দিলাম ফোন। কোথা থেকে? না ঘর থেকে না, ফোন দিলাম ঘরের সামনের তালগাছ তলা থেকে। যাতে কেউ না জানে। আরে আল্লা, এক ফোনেই কী যে খাতির…কত যে গোপন কথা, আম্মু-আব্বু মিঠা মিঠা রাজি, বড় আপুরা শাড়ি চুড়ি কেনা নিয়ে ইদানীং বেশি আলাপ করছে, ভাইয়ার বিরুদ্ধে আগডুম-বাগডুম অভিযোগ সব বলে ফেললাম! ভাবি কী যে খুশি…কী যে খুশি…খালি হাসে। খালি হাসে।
সেই সব ননদ-ভাবির মিষ্টি দিনে গোপন তথ্য আদান-প্রদান করতে করতেই তিন মাস হয়ে গেল। আব্বু-আম্মু মতামত দিলেন। আবার বৈঠক। বিয়েটা তাহলে হচ্ছে না! হচ্ছে না মানে হচ্ছে না। হ্যাঁ সন্দ্বীপেই হচ্ছে না, চট্টগ্রামেই হচ্ছে। মেয়েদের বাসা যে চট্টগ্রামে।
হুররে…হুররে! কী আনন্দ কী আনন্দ আমাদের। ব্যান্ড পার্টির পো পো। একমাত্র ভাইয়ার একমাত্র ভাবি ঘরে আসবে। দিনক্ষণ ঠিক। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭। সরকারি ছুটির দিনেই বিয়েটা ঠিক করা হলো। ভাইয়ার নিউজ এডিটরের তো ছুটি থাকতে হবে। নইলে বিয়ে কেমনে হবে।
বিয়ে পড়ালেন আমার পেনসিল নানাভাই (ছোটবেলায় তাঁকে পেনসিল নানাভাই ডাকতাম, উনি প্রিন্সিপাল থেকে পেনসিল হয়ে যান উচ্চারণের অক্ষমতায়)। বিয়ের দিন আরেক কাহিনি। আরেক মুছিবত। তিনি বিয়ের স্টেজে বিয়ে পড়াতে গিয়ে মোনাজাতে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে পুরা ইসলাম ধর্মের ইতিহাস বলা শুরু করেছেন। আর থামেন না। আমরা মনে মনে ভাবি, রাত মনে হয় স্টেজেই খতম করি দিব বুইড়াটা।
অবশেষে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পর ওনার খতমে মোনাজাত শেষে ভাবিকে বাসায় আনলাম। বাসায় আনার পরে বউয়ের মেজাজ ঠান্ডা থাকার জন্য ঘরের দরজায় দাঁড় করিয়ে মুরব্বিরা বাটিতে করে পানি খাওয়াল। আম্মু শখ করে পুত্রবধূর পায়ে সোনার নূপুর পরিয়ে দিলেন। তারপর আমাদের চার বোনের সে কী আনন্দ। ভাবিকে ঘরের মাঝখানে বসিয়ে ছোট্টবেলার গানটা ধরে সে কী নাচ—এমন মজা হয় না…গায়ে সোনার গয়না। ভাইয়া ভাবির বিয়ে হলো বাজল কত বাজনা।
আরে আরে, আমাদের সঙ্গে নাচছে সবাই। ভাবির ফুফি শাশুড়ি, নানি শাশুড়ি, খালা শাশুড়ি, আন্ডা বাচ্চা আনুমানিক কয়েক ডজন দেবর ননদ-আদুরি বাদুরি সবাই! এত হই রই রই করে সেই দিন যে মুক্তিকে আমরা ঘরে আনলাম আমরা জানতাম না, সেই অন্য জেলার মেয়ে মুক্তি, আমাদের সেই ভাবি আমাদের মুক্তি দেবে এত কিছু থেকে।
বছর চার পরে ঘরে দুটি চাঁদের টুকরা ছোট্ট আব্বু এনে, আমাদের ঘরের বাচ্চাবিহীন নীরবতা থেকে মুক্তি।
এত কিছু থেকে মুক্তি মেলানো লক্ষ্মী ভাবিটাকে ঘরে আনার দশ বছর পূর্ণ হয়েছে। আর এই দশ বছরে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। দশ বছর আগের কথা খুব মনে করি আজ। এই দশ বছরে কত কিছু থেকে দূরে আমি। কত প্রিয়জন দূরে চলে গেল।


