দ্বিতীয় ভৈরব ও তিতাস সেতু নির্মাণে অবশেষে ভারতীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের শর্তই মেনে নিচ্ছে বাংলাদেশ। পরিবর্তন করা হচ্ছে কন্ট্রাক রেশিও। মালামাল সংগ্রহে ভারতীয় ঋণে নেয়া সেতু নির্মাণের এ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই শর্তের কারণে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এ সংক্রান্ত একটি সম্মতি প্রস্তাব রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি)। বর্তমানে লাভ-ক্ষতির হিসাব করে প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে ইআরডি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সম্মতিপত্র পাঠাবে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও ইআরডি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল হাই বলেন, ভারতীয় ঠিকাদারদের শর্ত পূরণ করা হলেও বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং বাংলাদেশ থেকে বেশি পণ্য ও সেবা ক্রয় করলে আমাদেরই লাভ হবে। তাদের দেশের টাকা এদেশে বেশি খরচ হবে। তিনি জানান, প্রথম দিকে ভারত বলেছিল ৮০ শতাংশ পণ্য ও সেবা ভারত থেকে আমদানি করতে হবে। বাকি ২০ শতাংশ বাংলাদেশ বা অন্যান্য স্থান থেকে ক্রয় করা যাবে। কিন্তু পরে আলোচনার পর নির্ধারণ হয় ভারতীয় অংশে ৬৫ শতাংশ এবং অন্যান্য অংশে ৩৫ শতাংশ। কিন্তু ঠিকাদাররা কাজ করতে গিয়ে বাস্তবতার কারণে এখন ভারতীয় অংশের রেশিও কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় দফা মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ ছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে মালামাল সংগ্রহের জন্য (লাইন অব ক্রেডিড) এলওসির শর্ত মেনে মালামাল সংগ্রহে ভারতীয় অংশের ৬৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩৫ শতাংশ চুক্তিমূল্যে অর্থ ব্যয় করার কথা। প্রকল্পের দ্বিতীয় ভৈরব সেতু নির্মাণ করছে ইরকন-এফকন জেভি। আর দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ করছে গ্যানন-এফসিএলসিএল কনসোর্টিয়াম।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভৈরব ব্রিজ নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় ভারতীয় অংশে ৬২ এবং অন্যান্য অংশে ৩৮ শতাংশ এবং তিতাস ব্রিজের ক্ষেত্রে ভারতীয় অংশে ৬৭ দশমিক ৫২ এবং অন্যান্য অংশে ৩২ দশমিক ৪৮ শতাংশ মালামাল সংগ্রহ করা হবে মর্মে ঠিকাদারের উ™ৃ¬ত দর গ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় উভয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান কন্ট্রাক রেশিওতে মালামাল সংগ্রহে সমস্যার কথা উল্লেখ করে ভারতীয় অনুপাত কমানোর প্রস্তাব দেয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইরকন-এফকন জেভি ভৈরব ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারতীয় অংশে ৬২ শতাংশের পরিবর্তে ৫৫ শতাংশ এবং তিতাস ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে গ্যানন-এফএলসিএল কনসোর্টিয়াম ভারতীয় অংশে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশের পরিবর্তে ৪৫ শতাংশ করার জন্য আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়েছে, দাখিলকৃত বিলের বিপরীতে আইটি ৫ শতাংশ, ভ্যাট সাড়ে ৫ শতাংশ, ট্যাক্স-ভ্যাট সাড়ে ৩ শতাংশ এবং চুক্তিমূল্যের বিপরীতে ইন্স্যুরেন্স দেড় শতাংশসহ মোট ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এসব কারণে রেশিও পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতীয় দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যদি ভারত থেকে ইট, বালু ও সিমেন্টসহ ব্রিজ নির্মাণের আনুষঙ্গিক পণ্য নিয়ে আসে তাহলে তাদের অনেক বেশি ব্যয় বেড়ে যাবে। যেমন এসব পণ্য আনতে গেলে ভারতীয় অংশে কর দিতে হবে আবার বাংলাদেশ সীমান্তেও কর দিতে হবে। তাছাড়া ভারত থেকে এসব পণ্য নিয়ে আসতে অনেক বেশি খরচ পড়বে। সেক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশ থেকে ক্রয় করলে খরচ কম হবে। এবং কর সুবিধা পাবে। কিন্তু যেহেতু তাদের বিল পরিশোধ করে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক এবং তা ভারতীয় মুদ্রায় সেক্ষেত্রে রেশিওর বেশি টাকা এদেশে ব্যয় করতে পারছে না তারা। এ জন্যই রেশিও পরিবর্তনে তোড়জোড় শুরু করে। তবে রেল মন্ত্রণালয় বলছে, এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে না। কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ লাভ-ক্ষতির হিসাব করেই সম্মতির প্রস্তাব পাঠাতে চায় ভারতীয় হাইকমিশনে।
সূত্র জানায়, এর আগে ২০১৫ সালের ২৮ আগস্ট ভারতীয় এক্সিম ব্য্যাংক এবং চলতি বছরের ২০ মার্চ ভারতীয় হাইকমিশন থেকে রেশিও পরিবর্তনের জন্য সরকারের মতামত জানতে চাওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে ৩ এপ্রিল কনটেন্ট পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের মতামত চাওয়া হয়। রেলওয়ের মতামত পাওয়ার পর ১০ মে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯ জুন বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব আইন কর্মকর্তার মতামত নেয়া হয়। এতে আইন কর্মকর্তা বলেন, এলওসি গাইডলাইনের অনুচ্ছেদ-৫-এর বর্ণনার আলোকে রাষ্ট্রের আর্থিক কোনো ক্ষতি না হলে রেশিও পরিবর্তন করা যেতে পারে। এতে আইনগত কোনো বাধা নেই। এ মতামত পাওয়ার পর রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে ভারতীয় হাইকমিশনকে জানাতে ২৭ জুন ইআরডিকে চিঠি দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দিলেও ঋণের শর্তের কারণে বাস্তবায়ন বাধাগস্ত হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৩৩ কোটি এবং ভারতীয় ঋণ থেকে ৮২৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।


