বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি-নিয়োগ বাণিজ্যের আখড়া ‘এসেনশিয়াল ড্রাগস’

edclঅনিয়ম, দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে সরকারি মালিকানাধীন একমাত্র ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। ধরাকে স্বরা জ্ঞান মনে করে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো যা ইচ্ছে তা-ই করে চলেছেন প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা। আর তাদের এসব কর্মকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে বাহিরে আছেন এক শ্রেণীর দালালচক্র। আর এ কারণেই রাষ্ট্রের আয়ের বড় উৎস এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হওয়ার পথে। বন্ধ হওয়ার পথে প্রতিষ্ঠানটির দুটি ল্যাটেক্স প্রসেসিং প্লান্টও।

এ দুটি প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেলে সরকার হারাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। একই সঙ্গে বেকার হয়ে যাবেন প্রতিষ্ঠানটির কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহিদ নামে এক ব্যক্তি এই প্রতিষ্ঠানটির দালালচক্রের অন্যতম একজন। তার বাসা রাজধানীর রামপুরার মীরবাগ এলাকায়। রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানে বেশ কয়েকজনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানেও তার তদবিরে চলছে বেশ কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, অনির্বাচিত সিবিএ নেতাদের নৈরাজ্যের কারণেই হুমকির মুখে পড়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠেছে, সিবিএ নেতারা প্রতিষ্ঠানটিকে জিম্মি করে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তাদের ইচ্ছে মতো প্রতিষ্ঠানটি চালাতে গিয়ে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. ইহসানুল করিম ইডিসিএলকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সিবিএ নেতাদের ইচ্ছায় ফাইলে সই করার ফলে প্রতিষ্ঠানের অনেক সিদ্ধান্তই তিনি না জেনেই বাস্তবায়নের অনুমোদন দিয়ে দেন।

জানা গেছে, সরকারি ওষুধ উৎপানকারী প্রতিষ্ঠান ইডিসিএল-এ বর্তমানে অনির্বাচিত সিবিএ নেতাদের দাপুট। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন এমডির কারণে ওই সময় সিবিএ নেতারা প্রতিষ্ঠানের ভেতর কোনো খবরদারি করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি নিয়মমাফিক চলছিল। সরকারও রাজস্ব আয় করছিল। এ কারণে সিবিএ নেতারা তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।

কিন্তু তার মেয়াদকাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইডিসিএলের সব কটি শাখায় সিবিএ নেতাদের দাপট বেড়ে গেছে। ইডিসিএলের ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, বর্তমান এমডি ডা. ইহসানুল করিম যোগদানের পর অবৈধ সিবিএ নামধারী সভাপতি আবদুর রহমান, সেক্রেটারি দুলাল সরদার, রবিউল আলমসহ বেশ কয়েকজন পুরো প্রতিষ্ঠানটি জিম্মি করে রেখেছেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সিবিএ নেতা আবদুর রহমান অলিখিত এমডি হিসেবে পরিচিত। তার কথায় সব কর্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ইডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ইডিসিএল ১৮৪ কোটি ৪২ লাখ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৯৬ কোটি ৫৭ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৫৯ কোটি ৭২ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৯০ কোটি ২৮ লাখ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪২৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকার ওষুধ উৎপাদন করে। আর এ পাঁচ বছরে সরকারি কোষাগারে কর প্রদান করা হয়েছে ৩৭২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া করপূর্ব মুনাফা অর্জন করেছে যথাক্রমে ৫০ দশমিক ৪৫ কোটি, ৬৭ দশমিক ৫৮ কোটি, ৫৭ দশমিক ৮৮ কোটি, ৫৬ দশমিক ১৭ কোটি ও ৫৭ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে লোকসানের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

প্রায় ছয় মাস ধরে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো উৎপাদন নেই। শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। উৎপাদন বন্ধের ধারা চলতে থাকলে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বর্তমান এমডি গোপালগঞ্জে নির্মাণাধীন একটি প্রজেক্টের অনুকূলে প্রায় ৬০০ লোককে নিয়োগ প্রদান করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, এ নিয়োগে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এমডি নিজের পছন্দের লোকবল নিয়োগ দিয়েছেন।

অন্যদিকে, এমডির অদক্ষতা, সিবিএ নেতা ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইডিসিএলের মধুপুর ল্যাটেক্স প্রসেসিং প্লান্ট ও খুলনার প্লান্ট। এ দুটি প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় এক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারাবেন। মধুপুরের ল্যাটেক্স প্রসেসিং প্লান্ট খুলনার কনডম কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ করে। এটি বন্ধ হয়ে গেলে এবং খুলনার কনডম ফ্যাক্টরি চালু রাখতে হলে বিদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকার কাঁচামাল আমদানি করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোয় ইডিসিএল বিপুল পরিমাণ সিসি কিডস ও ডিডি কিডস উৎপাদন এবং সরবরাহের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও, অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান এমডি নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে একটি বেসরকারি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির কাছে তা ছেড়ে দিয়েছেন। এর ফলে সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় ইডিসিএল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জানা গেছে, প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেয়ার নিয়ম থাকলেও ইহসানুল করিম এমডি হওয়ার পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন সরকারি ওষুধ ল্যাবরেটরি নামে যাত্রা করে এটি। ৭৯ সালে নামকরণ হয় ওষুধ প্রডাকশন ইউনিট। ৮৩ সালে একে কোম্পানিতে রূপান্তর করে এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) নামকরণ করা হয়। ৯৪ সালে একে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

বর্তমানে এ কোম্পানির আওতায় ঢাকা ও বগুড়ায় দুটি ওষুধ তৈরির কারখানা এবং খুলনায় একটি কনডম তৈরির কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া গোপালগঞ্জে একটি কারখানার নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

উল্লেখিত অভিযোগের ব্যাপারে ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইহসানুল করিম বলেন, তার বিরুদ্ধে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে। তারা প্রতিষ্ঠানের ভালো চায় না। তারা প্রতিষ্ঠান ও সরকারবিরোধী চক্র বলে দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন