চট্টগ্রামে গত এক বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন ধর্মান্তরিত এক যুবকসহ দুইজন। প্রায় তিন মাস খোঁজ নেই এক মাদ্রাসা ছাত্রের। নিখোঁজ দুই যুবকের একজন ঝুলন দেবনাথ ধর্মান্তরিত হয়েছেন, তার নতুন নাম মুহাম্মদ ইব্রাহীম।
তিনজনের বিষয়েই নগরীর পাহাড়তলী ও আকবার শাহ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে পরিবার; যাদের নাম পাওয়া যায়নি সম্প্রতি র্যাবের দেওয়া নিখোঁজ ২৬২ জনের তালিকায়।
গত ১ জুলাই গুলশান হামলায় ঘরছাড়া যুবকদের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে দেওয়া নিখোঁজদের ১০ জনের প্রথম তালিকায় থাকা সাইফুল্লাহ ওজাকির জন্মও হিন্দু পরিবারে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনদপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামের জনার্দন দেবনাথের ছেলে সজিত চন্দ্র দেবনাথই এই সাইফুল্লাহ ওজাকি; যিনি স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আইএসে যোগ দিয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে নিখোঁজ যুবক ঝুলন নগরীর দক্ষিণ কাট্টলী পশ্চিম পাড়ার ও উজ্বল কান্তি নাথ লোহাগাড়া উপজেলার বড় হাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
ধর্মান্তরিত ওই যুবক গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ থাকলেও তার বাবা খগেন্দ্র দেবনাথ গত সোমবার পাহাড়তলী থানায় জিডি করেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান ওসি রণজিত বড়ুয়া।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে থানায় জিডি করার নির্দেশনার প্রেক্ষিতে জিডিটি করার কথা জানিয়ে খগেন্দ্র বলেছেন, দেশবিরোধী কোনো কাজে ঝুলন জড়িত হলে সেজন্য পরিবার দায়ী থাকবে না।
জিডিতে খগেন্দ্র দেবনাথ উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা ঝুলন ২০১৩ সালে পারিবারিকভাবে পার্বতী দেবী নামে এক মেয়েকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি আবার বিদেশে যান এবং পুনরায় ফিরে আসেন।
গত বছরে ২৭ মার্চ ঝুলন-পার্বতী দম্পতির একটি মেয়ে হয়।
জিডিতে বলা হয়েছে, সন্তান হওয়ার কিছুদিন পর দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হলে পার্বতী বাবার বাড়ি চলে যান। এরপর গত বছরের ২৫ মে ঝুলনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হলে ৩০ জুলাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ১২ অগাস্ট তিনি জামিনে ছাড়া পান।
খগেন্দ্র জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হলেও ঝুলন রাজি না হয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
তখন থেকে তাদের সঙ্গে ঝুলনের যোগাযোগ নেই উল্লেখ করে জিডিতে বলা হয়, গত ৫ নভেম্বর স্থানীয় দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর মাধ্যমে খগেন্দ্র জানতে পারেন, তার ছেলে ঝুলন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে ঝুলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়নি।
জিডির সঙ্গে সুপ্রভাত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিটি সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে ঝুলন উল্লেখ করেন, তিনি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে গত ২ নভেম্বর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত হয়ে তার নাম রাখেন মুহাম্মদ ইব্রাহিম।
এবিষয়ে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে ঝুলনের বাবা খগেন্দ্র দেবনাথ শহরের বাইরে আছেন বলে জানান। পরে বেশ কয়েকবার যোগোযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
সেলুন মালিক উজ্জ্বল নাথ এক বছরের বেশি সময় নিখোঁজ বলে তার পরিবারের ভাষ্য।
আকবর শাহ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ১০ জুন উজ্জ্বল নিখোঁজ হন বলে তার বড় ভাই কাজল জিডি করেছেন। থানা এলাকায় উজ্জ্বলের সেলুন আছে।
কাজল কান্তি নাথ বলেন, আকবর শাহ থানার বিশ্ব ব্যাংক কলোনির বি-ব্লক ও মসিজিদ এবং ফিরোজশাহ কলোনি এলাকায় উজ্জ্বলের তিনটি সেলুন আছে। তিনি গত বছরের জুনের প্রথম দিকে দোকান থেকে কিছু সময়ের কথা বলে বেরিয়ে আর ফেরেননি। অনেক খুঁজেও উজ্জ্বলকে না পেয়ে ১০ জুন জিডি করেন।
মাদ্রাসা ছাত্র রাকিব হোসেন প্রায় তিন মাস নিখোঁজ জানিয়ে তার মা হাসিনা আক্তার বলেন, একমাত্র সন্তান রাকিব নগরীর নিউ মনসুরাবাদ এলাকার শামসুল হক ক্বারী মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্র ছিল।
এপ্রিল মাসের প্রথম থেকে রাকিব নিখোঁজ জানালেও তারিখ বলতে পারেননি তিনি।
তার বিষয়ে গত ২২ এপ্রিল আকবর শাহ থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয় বলে জানান পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ারুল।
হাসিনা বলেন, “রাকিব মাদ্রাসায় আবাসিক ছাত্র হিসেবে থাকতেন। তিন মাস আগে মাদ্রাসা থেকে আমাকে জানানো হয়, রাকিবকে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর আমি মাদ্রাসায় গিয়ে নিজে খোঁজ করি। মাদ্রাসার শিক্ষকরা পরে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার জন্য একটি ছবি নেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের জিডি থানা গ্রহণ না করায় আমি থানায় গিয়ে জিডি করি।”
মাদ্রাসায় যাওয়ার বা শিক্ষকদের বিষয়ে রাকিবের কোনো অভিযোগ ছিল না বলেও দাবি করেন তার মা হাসিনা।
জিডির তদন্ত কর্মকর্তা আকবর শাহ থানার এসআই আনোয়ার হোসেন বলেন, রাকিব আগেও কয়েকবার পালিয়েছে। সর্বশেষ পালিয়ে যাওয়ার পর তার মা জিডি করেছেন। তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।


