রাজধানীর গুলিস্তানে জমজমাট হয়ে ওঠেছে চোরাই মোবাইল ক্রয়-বিক্রয় সিন্ডিকেটের ব্যবসা। মওলানা ভাসানি হকি স্টেডিয়াম মার্কেটে শতাধিক দোকানে প্রকাশ্যে চলছে চোরাই মোবাইল সেট কেনাবেচা। পুরোনো সেটের দাম কম থাকায় এবং স্বাচ্ছন্দে বেচাকেনার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় মোবাইল চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্রমেই বাড়ছে। চোরাই মোবাইল কিনে অনেকে পুলিশি ঝামেলায় পড়ছেন বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।
পুরানো মোবাইলগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করেন জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আল আমিন ইলেকট্রনিক্সের সত্ত্বাধিকারী জানান, বিভিন্নজনের কাছ থেকে পুরোনো ব্যবহৃত সেটগুলো কিনে তারা বিক্রি করেন। এছাড়াও যারা মোবাইল কিনতে আসেন, তারাও হাতের পুরোনোটি বদল করেন। প্রতিদিন কি পরিমাণ সেট ক্রয়-বিক্রয় করেন জানতে চাইলে তিনি আর কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।
আমিন ইলেকট্রনিক্সের ভেতর একটি মোবাইল মেরামতের (সার্ভিসিং) দোকান এবং বাইরে চারটি সাবলেট ভ্রাম্যমান মোবাইল ক্রয়-বিক্রয় দোকান ভাড়া দেওয়া আছে। দোকানগুলো মূলত: চাকা লাগানো একেকটি শোকেস। যা প্রয়োজনমতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যায়। তালা লাগানো ভ্রাম্যমান শোকেসগুলো রাতে দোকানের ভেতরে রেখে যান ভাড়াটিয়ারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবলেট ভাড়াটিয়া মোবাইল দোকানদার জানান, তিনি আট হাজার টাকায় শোকেস ভাড়া নিয়েছেন। অন্যরা পজিশন বুঝে ছয় থেকে আট হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছেন। স্থানভেদে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার অগ্রিম (সিকিউরিটি) জমা দিতে হয়েছে।
আলিফ স্পোর্টসের মালিক মো. কাইয়ুম খান জানান, তার দোকানের সামনে পুরোনো মোবাইল বিক্রির তিনটি দোকান আছে। এর মধ্যে দুটি তিনি ভাড়ায় দিয়েছেন। যার একটির ভাড়া সাত হাজার, অন্যটির ছয় হাজার। তার মতো মার্কেটের প্রায় সব দোকানের সামনেই এমন দুই থেকে চারটি মোবাইল দোকান ভাড়া দেওয়া আছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলিস্তানের হকি স্টেডিয়াম মার্কেটে নতুন মোবাইলের পাশাপাশি শতাধিক দোকানে প্রতিদিন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নানা মূল্যের কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক পুরানো (স্মার্টফোন) মোবাইল সেট কেনাবেচা হয়। যার প্রতিটির বাজার মূল্য তিন হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সে হিসেবে মাসে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকার মোবাইল কেনাবেচা হয়।
গুলিস্তান পাতাল মার্কেটেও শতাধিক মোবাইল ফোন মেরামতের দোকান রয়েছে। মেরামতের আড়ালে চলে পুরনো ফোন বেচাকেনা। বলতে গেলে অনেক কম দামে মোবাইল সেট মেলে এখানে। তবে এ মার্কেটে মোবাইল ফোন কিনে বেশি ঠকেন ক্রেতারা।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে সিনহা ইলেকট্রনিক্স, সাকিব ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রনিক্স কর্নার, আজমেরি ইলেকট্রনিক্স, দেওয়ান এন্টারপ্রাইজ, বাদল এন্টারপ্রাইজের দোকানের মালিকরা রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দোকানদার জানান, তারা একাধিক মাধ্যম থেকে পুরানো মোবাইল সেটগুলো সংগ্রহ করে থাকেন। এই তালিকায় সরাসরি চুরি, ছিনতাইয়ের সাথে জড়িতরা আছে। এছাড়া চোরাই মোবাইল সেট সংগ্রহ করে দোকানদারদের কাছে সরবরাহ করার জন্য এক প্রকার মধ্যসত্ত্বভোগীও গড়ে উঠেছে। তবে মোবাইল ব্যবহারকারীরাও তাদের পুরানো মোবাইল বিক্রি করতে আসেন- এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।
অপরদিকে তুলনামুলক কম দামে দেশি-বিদেশি নামি-দামি ব্র্যান্ডের পণ্য পাওয়া যায় বলে ক্রেতা সমাগমও নেহায়েত কম নয় এ মার্কেটে। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুণ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদেরই বেশি দেখা গেছে।
কথা হয়, ওয়াহিদ ও মনির হোসেন নামের দুই যুবকের সাথে। তারা জানিয়েছেন, কমদামে ভালো মানের মোবাইল কিনতে এসেছেন। অনেক দোকান ঘুরে দেখেছেন। পছন্দও হয়েছে। তবে দামে বনিবনা না হওয়ায় তারা মোবাইল নেননি।
মনির জানান, তিনি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় দুই গিগাবাইট (জিবি) র্যামের একটি নামি ব্র্যান্ডের মোবাইল খোঁজ করছেন। এমন মোবাইলের সন্ধানও তিনি পেয়েছেন। কিন্তু দোকানিরা আট থেকে ১২ হাজার টাকার কমে দিচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমন একটি নতুন মোবাইল সেটের ক্ষেত্রে বাজার মূল্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র সাহেদ হাসান একটি মাল্টিমিডিয়া স্মার্টফোন কেনার জন্য শো-রুমে যান। তিনি এলজির একটি (জি-২) মোবাইল পছন্দ করে দেখেন তার দাম ৩৯ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু তার বাজেট ১০ হাজার টাকা। পরে এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারেন, স্টেডিয়াম মার্কেটে কম মূল্যে ভালো ব্র্যান্ডের পুরানো মোবাইল সেট পাওয়া যায়।
সাহেদ গুলিস্তানের হকি স্টেডিয়াম মার্কেটের অনেকগুলো মোবাইল দোকানে যাচাই করে আল আমিন ইলেকট্রনিক্সে কাঙ্খিত এলজির জি-২ মডেলের পুরানো একটি মোবাইল পেয়ে যান। পছন্দ হওয়ার পর দর কষাকষি করে সাত হাজার পাঁচশ টাকা দাম ঠিক হয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে যখন তিনি ক্রয় রশিদ চান। দোকানদার কোনোভাবেই ক্রয় রসিদ দিতে সম্মত হননি। সাহেদ ক্রয় রশিদের জন্য বাড়তি টাকা দিতে চাইলেও দোকানদার রাজি হননি। ক্রয় রশিদ লাগবে এটা আগে কেন জানানো হয়নি এমন অভিযোগ করে দোকানদার সাহেদের সাথে বাদানুবাদ করেন। শেষে মোবাইল ছাড়াই বেরিয়ে যান সাহেদ।
কারণ হিসেবে সাহেদ জানান, তিনি একাধিক নাটক ও সিরিয়ালে দেখেছেন, হত্যা, অপহরণ ও চুরি-ডাকতির পর বিক্রি করে দেওয়া মোবাইলের সূত্র ধরে খুনি বা চোর-ডাকাত পর্যন্ত পৌঁছায় পুলিশ। তিনি এমন কোনো ঝামেলায় পড়তে চান না। তাই পুরানো হলেও কোনোরকম দলিলাদি ছাড়া তিনি মোবাইল কিনবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রশিদ না দেওয়ার ব্যাপারে আল আমিন ইলেকট্রনিক্সের দোকানদার বলেন, পুরোনো মোবাইলের বিক্রয় রশিদ হয় না। গুলিস্তানের শত শত দোকানে এভাবেই বিক্রি হচ্ছে। যার দরকার সে কিনছে। যার ক্রয় রশিদ দরকার সে নতুন মোবাইল কিনবে। তাহলে ক্রয় রশিদের অভাব হবে না।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ ও স্থানীয় নেতা, মাস্তানদের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করেই দীর্ঘ দিন ধরে চলছে চোরাই মোবাইল বেচাকেনার ব্যবসা।
স্টেডিয়াম মার্কেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা স্টেডিয়াম দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন (পীর) বলেন, দোকান মালিকদের দোকানের বাইরে শোকেস ভাড়া দিতে একাধিকবার নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের দাবি, সারা বছর বেচা-বিক্রি কম বিধায় তাদের পোষায় না। ফলে তারা শোকেজ মোবাইল দোকানগুলো ভাড়া দেন। তিনি মার্কেটে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও র্যাবের পক্ষ থেকে রেইড দেওয়ার (অভিযান চালানো) কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি বলব না এই মার্কেটে চোরাই মোবাইল কেনা-বেচা হয় না। তবে এই মার্কেটের সব মোবাইলই চুরির মাল না। অনেকে এখানে তাদের প্রয়োজনে পুরানো মোবাইলও বিক্রি করেন।’


