বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: ত্রাণের জন্য হাহাকার

Kurigram-Flood-Situation-photo-1উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর প্রবল বর্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা, পদ্মা, যমুনা ও সুরমাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বন্যাদুর্গত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে নদী ভাঙনের শিকার আর বানভাসি পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। ফলে ত্রাণের জন্য ঘরে ঘরে এখন হাহাকার চলছে। বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ পাশের উঁচু জায়গায়।

কুড়িগ্রাম, ফুলবাড়ী, চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী ও রৌমারী : রোববার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। সাত দিন ধরে পানিবন্দি মানুষের হাতে কাজ নেই। ঘরে খাবার নেই। খাবার থাকলেও নেই জ্বালানি, তরিতরকারি, লবণ, তেল, মরিচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ফলে এখন ঘরে ঘরে খাদ্যের জন্য হাহাকার বিরাজ করছে। ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়া দুই লক্ষাধিক মানুষের দিন কাটে অর্ধাহার-অনাহারে।

এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দ মিলেছে ১৯২ টন চাল ও ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়ায় ৯৬০ গ্রাম চাল ও ৪ টাকা ৩৭ পয়সা। ফলে প্রতিদিন জনপ্রতিনিধিদের বাড়িতে বাড়ছে ভুখা মানুষের ভিড়।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজার রহমান জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ও ধরলায় বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। ৯ উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

নাগেশ্বরীতে পানির তোড়ে ভেঙে গেছে বামনডাঙ্গা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ কালীগঞ্জে ওয়াপদা-ধনীরভিটা রাস্তা। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরও প্রায় দুই শতাধিক গ্রাম। পানি উঠেছে এসব এলাকার প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ভেসে গেছে তিন শতাধিক পুকুরের মাছ। তলিয়ে গেছে আউশ ধানক্ষেত ও রোপা আমন বীজতলা। রৌমারীতে ১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

লালমনিরহাট: জেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে নদীভাঙনের শিকার হয়ে পড়েছেন প্রায় এক হাজার পরিবার। এসব মানুষের মধ্যে সরকারি যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ত্রাণের জন্য বানভাসি আর নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে।

গাইবান্ধা : জেলায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। পানি বৃদ্ধির ফলে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার এবং করতোয়া নদীর পানি কাটাখালী পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে ওই চারটি উপজেলার ২৭টি ইউনিয়নের ১৭৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭০ জন। এছাড়া ওই চার উপজেলায় ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাতে ১ হাজার ২২০ জন বন্যার্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

ডিমলা (নীলফামারী): রোববার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিস্তার উজানে গোজলডোবা ব্যারাজে পানি বোরবার দুপুর ১২টায় বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

তিস্তার পানি বৃদ্ধিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত অপরদিকে তিস্তার ভাঙনে সর্বস্বান্ত পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। রোববার সকাল থেকে শতাধিক পরিবার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তিস্তার তীরের বাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর (জামালপুর): দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যা দুর্গত এলাকার লোকজনের মধ্যে সাপের আতংক দেখা দিয়েছে। ইসলামপুর উপজেলায় মানুষের খাবার ও গো-খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

বগুড়া: সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন গ্রাম ও জনপদ। রোববার সকালে ২৪ ঘণ্টায় পানি ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ৯ ইউনিয়নের ৩০ গ্রামের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। ৪৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে।

ফরিদপুর : চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার বিকাল ৫টায় উপজেলা পদ্মা নদীতে বন্যার পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে ফদিরপুর পাউবো সূত্র জানিয়েছে।

সিলেট : সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি বাড়ছে। কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সুরমার পানি। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ছাড়াও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা।

সুনামগঞ্জ : জেলার বিভিন্ন উপজেলার কমপক্ষে ৯০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বেশ কিছু এলাকায়। বন্যার পানিতে সদর উপজেলা ও ধর্মপাশা উপজেলায় নিখোঁজ রয়েছে দুজন।

রাজশাহী : রাজশাহীতে পদ্মায় পানির প্রবাহ বেড়েছে। রোববার বিপদসীমার সীমার ১ দশমিক ৫৫ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এককালের প্রমত্তা এ পদ্মা। রাজশাহীতে পদ্মার বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। ফলে ভাঙন দেখা দিয়েছেন জেলার বাঘার বিস্তীর্ণ এলাকায়।

এছাড়া রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই দেখা দিয়েছে ভাঙন। বালির বস্তা ফেলে তা ঠেকানোর চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভাঙন আতংক রয়েছে নগরীর পশ্চিমাংশ থেকে পবার সোনাইকান্দি এলাকাতেও।

আরও পড়ুন