সুশান্ত রায়চৌধুরী, নয়াদিল্লি থেকে
নিরাপত্তার ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বুধবার ২৭ জুলাই নয়াদিল্লীতে তাদের বার্ষিক বৈঠকে বসবেন। তিন দিনব্যাপী এই বৈঠক ২৭ জুলাই শুরু হয়ে ২৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের উপস্থিতিতে এই বৈঠকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে বলে সূত্রের খবর।
ভারত সফর সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার ঢাকায় বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের, বিশেষত নিরাপত্তা এবং জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়টি প্রাাধান্য পাবে, কেননা উভয় দেশই সন্ত্রাসের হুমকির মধ্যে রয়েছে। মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থ নিশ্চিত ও রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’
ঢাকায় বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একজন আধিকারিক জানান, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের আলোচনার মূল এজেন্ডা হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দুই প্রতিবেশির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আট সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। এই প্রতিনিধিদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান ছাড়াও থাকবেন পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ, কোস্ট গার্ডের প্রধান রিয়ার এডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার রকিবুর রহমান প্রমুখ।
সফরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করবেন।
বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবারের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি ও বন্দী বিনিময় চুক্তি সংশোধনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বৈঠকে উভয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
সূত্র জানায়, দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে জঙ্গী ও সন্ত্রাস প্রতিরোধের ইস্যুটিই প্রাধান্য পাবে। ঢাকার গুলশানে জঙ্গী হামলার পর উভয় দেশই জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামিক স্টেট (আইএস) প্রতিরোধে দুই দেশ কিভাবে কাজ করবে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
এছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দী বিনিময় চুক্তির সংশোধনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সহজে অপরাধী হস্তান্তরের লক্ষ্যে এই সংশোধন করা হতে পারে। এখন অপরাধী হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে বন্দী বিনিময় চুক্তি সংশোধন হলে আদালতের রায়ের জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না। খুব দ্রুত দুই দেশ বন্দী বিনিময় করতে পারবে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বন্দী বিনিময় চুক্তি হওয়ার পর তা বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তির এই অংশ সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হলে সম্প্রতি মন্ত্রিসভা বৈঠকে বন্দী বিনিময় চুক্তির সংশোধনী আনা হয়। এছাড়া এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ভিসা ব্যবস্থা সহজ করা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। এছাড়া ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন সহজে ভিসা দেয়ার জন্য যে সাময়িক ব্যবস্থা চালু করেছিল, তা নিয়মিত করা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় অপরাধের বিষয়টিও আলোচনায় উঠবে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশের তরফে সন্দেহভাজন জঙ্গীদের একটি তালিকা ভারতের হাতে তুলে দেয়া হতে পারে। সন্দেহভাজন এই জঙ্গীরা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে লুকিয়ে রয়েছে বলে সন্দেহ করছে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগেই ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বিশেষ ব্রিফিং দিতে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের ব্যবস্থা করেছে। এতে ভারতের আসাম, হায়দরাবাদ, নাসিক, বিজনোর, ভটকল, কোঝিকোর বা কাসাদগড়, মুজাফফরনগরের মতো বিভিন্ন শহরে আইএস কিভাবে জাল বিস্তার ও তরুণদের রিক্রুট করছে সেটা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জামা’আতুল মুজাহিদীন বা জেএমবি জঙ্গীরা কিভাবে শিকড় বিস্তার করছে সেটাও তুলে ধরবেন ভারতীয় গোয়েন্দারা।
২৭ জুলাই দিল্লীতে পৌঁছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ’র সদর দফতরে যাবেন। এসময় এনআইএর প্রধান শারদ কুমারের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এখানে ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে জঙ্গীদের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়ে দু’জনের মধ্যে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজীব মহর্ষি, উত্তর-পূর্ব ভারতের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব সত্যেন্দ্র গর্গ, বিএসএফের ডিজি এ কে শর্মা, বিদেশ মন্ত্রকের বাংলাদেশ বিষয়ক যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন এই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।


