প্রাচীন ইতিহাসের গবেষকরা সে যুগের মানুষের নৈতিকতা অর্থাৎ ‘মর্যালিটি’ নিয়ে মাঝেমাঝেই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাঁদের চিন্তাটা মূলত এই নিয়ে যে, ‘একাল’-এর নৈতিকতার সঙ্গে কোনওভাবেই খাপ খায় না মহাকাব্যের নৈতিকতা।
অথচ, ভারত্র মতো দেশে রামায়ণ ও মহাভারত-কে আদশর্শ গ্রন্থ হিসেবে তুলে ধরার বিভিন্ন প্রয়াস বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়। এর মধ্য হয়তো রাজনৈতিক রফুচক্কর রয়েছে, কোনও বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ক্ষমতায়নের ভাঁজভুঁজ রয়েছে। সব মিলিয়ে এমন কিছু ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে, যা এ কালে খোলাখুলি আলোচনা হলে সমস্যা দেখা দিতেই পারে।
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাস নিয়েও একই বিড়ম্বনা দেখা দেয় খ্রিস্টীয় ইউরোপে। ১৯ শতকের ইতিহাসবিদরা মহাকাব্যিক গ্রিক সমাজকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন। একইভাবে, ভারতের মাহাকাব্যের যুগের নৈতিকতা, বিশেষ করে যৌননৈতিকতা নিয়েও বিড়ম্বনায় ভোগেন আজকের ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনীতির প্রবক্তারা। তথাকথিত যুক্তিবাদীরা বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে তাঁদের আক্রমণ করেন। তাঁরা দেখান, ‘আদর্শ’ হিসেবে বর্ণিত টেক্সটগুলিতে এমন কিছু ব্যাপার রয়েছে, যা আজকে ঘটলে শিউরে উঠতে হত।
দেখা যাক তেমন কয়েকটি ‘মহাভারতীয়’ অনৈতিকতাকে।
• মহাভারত-এর ‘আদিপর্ব’-এর ৬৩ অধ্যায়ে ঋষি পরাশর ও মৎস্যগন্ধার মিলন ছিল প্রকাশ্য। আবার, আদিপর্বের-ই ১০৪ তম অধ্যায়ে উত্থতের পুত্র দীর্ঘতমা জনৈকা নারীর সঙ্গে জনসমক্ষেই রমণ করেছিলেন।
• পৌরাণিক যুগে কি ভারতে অজাচার প্রচলিত ছিল? প্রাচীন মিশরের মতো মাতৃগমন বা ভগ্নীগমন কি যথেচ্ছ ছিল? ‘হরিবংশ’ থেকে জানা যাচ্ছে, বশিষ্ঠের কন্যা শতরূপা পিতাকেই স্বামী হিসেবে জানতেন এবং উপগত হতেন। একই গ্রন্থে প্রজাপতি দক্ষ তাঁর কন্যাকে তাঁর পিতার সঙ্গে উপগত হতে বলেছিলেন।
• মহাভারত-এর আদিপর্বে খোলাখুলিই বলা হয়েছিল, যদি কোনও অবিবাহিতা নারী তাঁর কামক্ষুধা চরিতার্থ করতে চান, তবে তা অবশ্যই পূরণ করতে হবে। পরে উলুপী অর্জুনকে এই কথাই মনে করিয়ে দেন যে, কামার্তা নারীর কাম চরিতার্থ করা পুরুষের ‘ধর্ম’।
• ঋগ্বেদ-এর ১০ম মণ্ডলে যম-যমী সংবাদে ভ্রাতার প্রতি ভগ্নীর যৌনাকাঙ্ক্ষার কথা খোলাখুলি ব্যক্ত করা হয়েছিল। যম যমীর প্রস্তাবে অসম্মত হলে যমী তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন, ভগ্নী অতৃপ্ত অবস্থায় থাকলে ভ্রাতারই কর্তব্য তাঁকে শান্ত করা।
• মহাভারত-এই উল্লিখিত রয়েছে, কর্ণের রাজ্য অঙ্গে নারী ও শিশু কেনা-বেচা হত।
এই তথ্যগুলি থেকে যদি কেউ প্রত্যক্ষভাবে ধর্মকে আক্রমণ করতে চান, করতেই পারেন। তবে তা করার আগে এটা মনে রাখা প্রয়োজন, এই নৈতিকতার ইতিহাস মোটামুটি সারা পৃথিবীতেই কমন। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘যৌনতার ইতিহাস’-এ প্রাচীন গ্রিকদের উভকামিতা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একটা জরুরি ইঙ্গিত রেখেছিলেন, সেটা এই— প্রাচীনকে বুঝতে গেলে একটা চিন্তার ব্যায়াম প্রয়োজন। সেই কাল ও পরিসরের উপযুক্ত মহিমার সাপেক্ষে তাকে দেখতে না পারলে তাকে ‘অনৈতিক’ বলে মনে হবেই।


