বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

নির্বাচন নয়, জাতীয় ঐক্যেই বিএনপির নজর!

Jatiyo Oikko‘নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন। আড়াই বছর চলে গেছে। হাতে আছে মাত্র দুই বছর। ছয় মাস যাবে বলতে বলতেই। সেজন্য আপনারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরুন।’— প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যের পর নড়েচড়ে বসেছে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিও।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তার এ বক্তব্যকে নিজেদের ‘দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতারা। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মূলত বিএনপির দাবি মেনে নিয়েছেন বলেও মনে করছেন তারা।

তবে এ বক্তব্যকে অনেকে ইতিবাচকভাবে নিলেও কেউ কেউ বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একাধিক জঙ্গি হামলার পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এরই চাপে সরকার বাধ্য হয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারো মতে, জঙ্গি ইস্যু ও বিএনপির জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকে ধামাচাপা দিতে এ বক্তব্য।

দলটির স্থায়ী কমিটির ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান  বলেন, ‘বিএনপির দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাছাড়া এ দাবি এখন দেশের সব জনগণের। তাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে আমরা ভালভাবেই দেখছি।’

বিএনপি বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নেই উল্লেখ করে স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘কাউন্সিলের পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া সাংগঠনিকভাবে অনেক কাজ এখনো বাকি আছে। বিএনপি আস্তে আস্তে সাংগঠনিক দিককেই গুরুত্ব দিয়ে এগুচ্ছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচনে যাওয়ার ইচ্ছে নেই বিএনপির।’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়েছে কিনা? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনো আলোচনা হয়নি। তবে হবে। প্রধানমন্ত্রী তো আর এমনিতেই এমন কথা বলেননি। এটার পিছনে কোনো কারণ তো অবশ্যই রয়েছে। তাই সার্বিক দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।’

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলে আসছে বিএনপি। দলটি বলছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেশের বেশিরভাগ মানুষ তাদের ভোট দেয়নি। সরকার একতরফাভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। তাই তাদের পূর্ণমেয়াদ (৫ বছর) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার থাকার কোনো নৈতিক অধিকার রাখে না। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি বর্তমান সরকারের এক বছর পূর্তিকে (২০১৫ সালে) ঘিরে অনির্দিষ্টকালের জন্য হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি ডাকে। কিন্তু সরকারের বাধা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় চার মাসেই ওই কর্মসূচি স্থগিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার পতনে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি দলটি। বর্তমানে সভা-সেমিনারেই সীমিত হয়ে আছে সাংগাঠনিক কর্মকাণ্ড।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান  বলেন, ‘কোনো কিছুকে ধাপাচাপা দেয়ার প্রয়োজন হলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন নির্দেশনা তো আর নতুন নয়। হয়ত বা এটা কোনো নীল নকশার অংশ। তাই বিষয়টিকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি না। তবে নির্বাচনের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার সেটার জন্য বিএনপিকে আলাদা করে প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজন হবে না। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারলেই বিএনপি বিজয়ী হবে।’

তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিএনপির এ নেতা। সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে স্বীকার করে নোমান বলেন, ‘বিএনপির এখন যে সাংগঠনিক অবস্থা তা হয়ত তেমন শক্তিশালী না। তার পরেও আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে না বলে আমি মনে করি। তাই আগামী নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়েই সাংগঠনিকভাবে এগুচ্ছে বিএনপি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক শীর্ষ নেতা  বলেন, ‘বর্তমান সরকার মুখে বলে এক, কাজে-কর্মে আরেক। তাই সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায় নতুন কিছু দেখছি না। একটা বিষয়কে ধামাচাপা দিতেই মূলত তিনি আরেকটি বিষয় উত্থাপন করেন। এটাও হয়তবা তারই অংশ।’

কারণ হিসেবে এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘নিম্ন আদালতে খালাস পাওয়া শর্তেও এক মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সাজা দেওয়া হল। এর মাধ্যমে সরকার মূলত বিএনপিকে মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে ব্যস্ত রাখতে চাইছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি জাতীয় ঐক্যকে সাড়া না দিয়ে এখন আবার দলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলছে। তাই এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট, সরকার জাতীয় ইস্যু নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করছে। মূল উদ্দেশ্য আজীবন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা।’

জাতীয় ঐক্য নিয়ে ভাবছে বিএনপি
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাড়া না দেওয়ায় এ বিষয়টি নিয়ে অন্যভাবে ভাবছে বিএনপি। বিএনপির এক শীর্ষ নেতা  জানান, দুই-একদিনের মধ্যেই চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০-দলীয় জোটের বাইরে থাকা শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন। এ বিষয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের চিঠি দেওয়া হবে। মূলত এ সব বিষয় দেখভাল করছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

জানা গেছে, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও জেএসডি প্রধান আ স ম রবের সঙ্গে চা চক্রে বসবেন ২০ দলীয় জোটনেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

এ বিষয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান  বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে বিভিন্ন দলের সঙ্গে কথা হচ্ছে। কারণ বিএনপি মনে করে সবার আগে দেশ। তাই মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

আরও পড়ুন