বাংলাদেশের প্রতিবেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ‘পশ্চিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু বঙ্গ বা বাংলা নামে রাজ্যের নামকরণ করবে। মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মন্ত্রিসভায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
রাজ্যের মন্ত্রিসভায় সে প্রস্তাব মঙ্গলবার পাসও হয়ে গেছে, এখন শুধু বিধানসভা আর পার্লামেন্টে আলোচনার অপেক্ষা। আগামী ২৯ ও ৩০ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে বিধানসভায় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ কেন পশ্চিম শব্দটি বাদ দিতে চাইছে তার একটি মজার কারণ রয়েছে।
সূত্রপাত দিনকয়েক আগে দিল্লিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সম্মেলনে।
সেই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন দেশের সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বলার পালা আসে সবার শেষে। আর তার আগের বক্তারা সবাই নিজেদের নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি বেশি বলতে থাকায় তিনি নিজের বরাদ্দ সময়টুকুও পুরোটা পাননি। খুব তাড়াহুড়ো করে কোনওমতে তাঁকে বক্তৃতা শেষ করতে হয়।
আসলে এই রাজ্যের নাম ইংরেজিতে ওয়েস্ট বেঙ্গল (West Bengal) হওয়ার কারণে যখন সব রাজ্যকে নিয়ে কোনও সম্মেলন হয়, তখন ইংরেজি বর্ণানুক্রমে রাজ্যগুলিকে ডাকা হয় বলে ডব্লিউ দিয়ে শুরু ওয়েস্ট বেঙ্গলের নাম আসে সবার শেষে। ফলে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজ্যের ইংরেজি নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ নিয়ে বেশ বিরক্ত বলেই জানা গেছে। আর সেটাই রাজ্যের নাম পরিবর্তনের একটা প্রধান কারণ।
দিল্লি থেকে ফিরে এসেই তিনি রাজ্যের নাম পরিবর্তন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার নির্দেশ দেন যার ফলে ২ আগস্ট মঙ্গলবার মন্ত্রিসভা এই প্রস্তাব পাস করলো।
আগেও উদ্যোগ হয়েছিল:
২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যের নামবদলের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চেয়ে আসছেন রাজ্যের নামবদল হোক। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই এ নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন মমতা। তখনই ঠিক হয়, রাজ্যের নাম বদলের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর পরে তা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য না দেখা গেলেও, দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে তা চূড়ান্ত করল রাজ্য মন্ত্রিসভা।
অতীতেও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল একাধিকবার। কিন্তু কখনোই তা বাস্তবায়ন হয়নি। বামপন্থীরা যখন রাজ্যের ক্ষমতায় ছিলেন তখনও একবার রাজ্যের নাম ‘বঙ্গ’ করার জন্য তারা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এমন কী মমতা ব্যানার্জির সরকার তাদের প্রথম দফাতেও ইংরেজিতে ওয়েস্ট বেঙ্গল নামটি ফেলে দিয়ে ইংরেজিতেও পশ্চিমবঙ্গ নাম রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
আসলে রাজ্যের অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ নামের মধ্যে ‘পশ্চিম’ শব্দটি দেশভাগের করুণ ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে; সেটা অযথা মুছে ফেলার কোনও মানে হয় না। তারা দৃষ্টান্ত দেন, দেশভাগের ক্ষত যখন জার্মানিকে বহন করতে হয়েছে, তখনও কিন্তু সীমান্তের দুপারের ভূখণ্ড পশ্চিম জার্মানি ও পূর্ব জার্মানি নামেই পরিচিত ছিল। একই রকম ইতিহাস আছে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার। সে সব দেশে কখনোই নাম থেকে ওই ভৌগোলিক অর্থবোধক অংশটা মুছে ফেলার দাবি ওঠেনি।
আশির দশকে পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে ক্ষমতাসীন সিপিএম যখন ‘বঙ্গ’ নাম রাখার প্রস্তাব করেছিল, তখন কলকাতার বিখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ সে সময়কার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘কেন রাজ্যের নাম বঙ্গ রেখে উনি কী করবেন? উনি বঙ্গেশ্বর হতে চান না কি?’
আজ সেই মন্তব্য স্মরণ করেই রাজ্যের এক প্রথিতযশা লেখক ও ইতিহাসবিদ বলছেন, ‘রাজ্যের নাম বদলালে মমতা ব্যানার্জিকেও আমরা বোধ হয় বঙ্গেশ্বরী নামে ডাকতে পারবো!’


