শেষ মুহূর্তে এসে আটকে গেল আলোচিত ব্যবসায়ী ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ও তাঁর ভাই আহমেদ সোহেল ফশিউর রহমানের (এ এস এফ রহমান) ধানমন্ডির বাড়ির নিলাম।
মঙ্গলবার রাত নয়টায় আদালতের এই স্থগিতাদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনালী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিদার মো. আবদুর রব। তিনি বলেন, ‘নিলামের ওপর উচ্চ আদালত তিন মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। সন্ধ্যার পর এই স্থগিতাদেশের আদেশ এক আইনজীবীর প্যাডে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে এসেছে।’
বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা ২২৮ কোটি টাকা আদায়ের অংশ হিসেবে ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের ১৭ নম্বর (নতুন) প্লটের ১ বিঘা বা ৩৩ শতাংশ জমির ওপর স্থাপিত বাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনার নিলাম ডেকেছিল সোনালী ব্যাংক।
ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিলামের সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। আজ বুধবার ব্যাংকটির মতিঝিল স্থানীয় কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপকের কক্ষের টেন্ডার বাক্সে এ সম্পত্তি কিনতে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত আবেদন গ্রহণের সময় নির্ধারিত ছিল। পত্রিকায় দেওয়া নিলাম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এদিন বেলা সোয়া তিনটায় দরপত্র খোলার কথা ছিল। সেভাবেই সব প্রস্তুতি গুছিয়ে নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় নির্ধারিত অফিস সময়ের মধ্যে নিলামের বিষয়ে সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু ছয়টার পর নিলামের ওপর আদালতের তিন মাসের স্থগিতাদেশের চিঠি পৌঁছায় ব্যাংকের হাতে। তাতে শেষ মুহূর্তে এসে নিলাম প্রক্রিয়াটি আটকে যায়।
মঙ্গলবার রাত ১০টায় সালমানের পক্ষের আইনজীবী শাহ মনজুরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও মো. সেলিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত সোমবার নিলামের ওপর এই স্থগিতাদেশ দেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্থগিতাদেশের বিষয়টি সোনালী ব্যাংককে জানানো হয়েছে।
জিএমজি ছিল ২০১০ সালে শেয়ারবাজার ধসের আগে অন্যতম আলোচিত একটি কোম্পানি। দীর্ঘদিনের লোকসানি এই কোম্পানিকে কারসাজির মাধ্যমে লাভজনক দেখিয়ে প্রথমে প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করা হয়। এরপর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে শেয়ারবাজার ধসের পর সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও জিএমজির কারসাজির বিষয়টি উঠে আসে। কমিটির প্রতিবেদনে সালমান এফ রহমানের বিষয়ে সতর্ক থাকতেও বলা হয়েছিল। ১৯৯৬-এর শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতেও তাঁর নাম রয়েছে। এই সালমান এফ রহমান আশির দশক থেকেই দেশের একজন শীর্ষ ঋণখেলাপি হিসেবে আলোচিত।
জিএমজির সাবেক একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সালমান এফ রহমান জিএমজির কর্তৃত্ব নেওয়ার পর কোম্পানিতে নতুন করে বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাংকঋণ ও প্রাক্-প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা প্রিআইপিও প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগের সিংহভাগ অর্থের সংস্থান করা হয়। ২০১০ সালে শেয়ারবাজার ধসের আগে জিএমজিকে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগে বাজারে ধস নামলে ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তালিকাভুক্তির আশায় যেসব বিনিয়োগকারী প্লেসমেন্টের মাধ্যমে কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের সিংহভাগই এখনো বিনিয়োগের সেই অর্থ ফেরত পাননি।
জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা ২২৮ কোটি টাকা আদায়ে ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের এক বিঘা জমির নিলাম ডেকেছিল সোনালী ব্যাংক। আদালত ওই নিলামের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেওয়ায় আটকে যায় নিলাম প্রক্রিয়া
এদিকে নিজের সম্পত্তি নিলামের বিষয়টি জানতে একাধিক দফায় সালমান এফ রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে তাঁর পক্ষে নিযুক্ত একটি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য পাঠানো হয়। তাতে সালমান এফ রহমান বলেন, ‘বাড়ি নিলামের ব্যাপারে আমরা আদালতের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছি। আমরা খুব শিগগির সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ পরিশোধের প্রস্তাবনা নিয়ে বসব। আশা করছি, এটা আদালতের বাইরেই নিষ্পত্তি হবে।’
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঋণের টাকা উদ্ধারে বেক্সিমকো গ্রুপের দুই কর্ণধারের ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের ১৭ নম্বর প্লটে (নতুন) ১ বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমি এবং তার ওপরের ভবনসহ সব স্থাপনা ব্যাংক নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে শতকোটি টাকা ঋণসুবিধা নেওয়া হয় জিএমজির নামে। বর্তমানে জিএমজির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
জিএমজি এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাব সাত্তার মঙ্গলবার ২ আগস্ট সন্ধ্যায় বলেন, ২০১২ সালের শেষের দিকে এসে জিএমজির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ২০০৮-২০০৯ সালের দিকে জিএমজির সঙ্গে সালমান এফ রহমান যুক্ত হন। তখন সিংহভাগ শেয়ারের মালিকানা চলে যায় তাঁর কাছে।
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জিএমজির নামে ঋণের জন্য ব্যাংকটিতে প্রথম হিসাব খোলা হয় ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় শাহাব সাত্তার ও তাঁর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোম্পানিটির বিপরীতে সাড়ে নয় কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়। এরপর জিএমজির মালিকানা সালমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কাছে যাওয়ার পর ২০১২ সালের শুরুতে নতুন করে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ঋণসুবিধা নেওয়া হয়। ওই ঋণের বিপরীতেই ধানমন্ডির সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়েছিল বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। তবে ঋণ নেওয়ার পর একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর ওই ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ না হওয়ায় পুরো ঋণটিকে পুনঃ তফসিল করে সোনালী ব্যাংক। এরই মধ্যে জিএমজির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রথম দফায় পুনঃ তফসিলের সুবিধা দিয়েও নিয়মিতভাবে ঋণের কিস্তি উশুল করতে ব্যর্থ হয় ব্যাংক। ফলে ২০১৩ সালে ঋণটি দ্বিতীয় দফায় পুনঃ তফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা হয়। এ ছাড়া সাত কোটি টাকারও বেশি ঋণকে সুদবিহীন ব্লক হিসেবে স্থানান্তরের সুবিধা দেয় ব্যাংক।
এই ঋণ এখন অনারোপিত সুদসহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। নানা চেষ্টা-তদবির করে ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে নিয়ম অনুযায়ী বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তুলতে ১২ জুলাই সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সোনালী ব্যাংক।
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০১৩-এর ১২(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিবাদীর কাছ থেকে কোনো স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে, অস্থাবর সম্পত্তি দায়বদ্ধ রেখে ঋণ প্রদান করলে এবং বন্ধক প্রদান বা দায়বদ্ধ রাখার সময় সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করলে তা বিক্রয় না করে, বিক্রয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ না হয়ে, সমন্বয় না করে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না।


